বাংলাদেশে হিন্দুরা নন, ভারতে মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে

বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর নির্যাতন হয় না। তারা বাংলাদেশে সুরক্ষিত। বরং ভারতে মুসলমানরা অসুরক্ষিত। সেখানে মুসলমানরা নির্যানের শিকার হয়’-বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি।

ভারতের আসামের প্রভাবশালী বেসরকারি টিভি চ্যানেল প্রতিদিন টাইমসকে দেয়া সাক্ষাতকারে এমন মন্তব্য করেছেন তিনি। গত মঙ্গল ও বুধবার আসামের গুয়াহাটিতে দু’দিনব্যাপী ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সি ও প্রধানমন্ত্রী অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সম্মেলনে বাংলাদেশের সাথে ভারতের উত্তর পূর্ব ৮টি রাজ্যের ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারণে টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্তে একমত হয়েছেন দু’দেশের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।

প্রতিদিন টাইম। প্রতিদিন টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাক্ষাতকারে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুন্সি এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতন হয় না বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেছেন,গরুর গোশত খাওয়া নিয়ে ভারতে মুসলমানরা নির্যাতনের শিকার হয়। ভারতের উত্তর অংশে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে।

এদিকে আজ বৃহস্পতিবার আসামের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক যুগশঙ্খ পত্রিকায় গুয়াহাটি, শিলচর ও কলকাতা সংস্করণে ‘বাংলাদেশের হিন্দুরা সুরক্ষিত, ভারতের মুসলিমরা নন’ শিরোনামে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সির মন্তব্য সংবলিত সংবাদ গুরুত্বসহকারে ছেপেছে। গুয়াহাটি ও শিলচর সংস্করণে প্রধান শিরোনাম ছিল এটি।

বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুন্সির উদ্ধৃতি দিয়ে যুগশঙ্খের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘…আসামে নাগরিকপঞ্জি নবায়ন নিয়ে বাংলাদেশ ততটা চিন্তিত নয়, কিন্তু চিন্তিত দেশের বিভিন্ন অংশে গো মাংস (গরুর গোশত) ভক্ষণের নামে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নিয়ে। আসামে প্রব্রজনকারীদের যেভাবে বাংলাদেশী বলে তাচ্ছিল্য করা হয়, সেটা নিয়েও তারা চিন্তিত। তাই বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের এই অঙ্গরাজ্যের জমিতে দাঁড়িয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সির দাবি, ‘বাংলাদেশে হিন্দুরা পুরোপুরি সুরক্ষিত রয়েছেন। কিন্তু, সর্বত্র না হলেও ভারতের কিছু কিছু স্থানে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চলছে। গো-মাংসের (গরুর গোশত) নামে নির্যাতন করা হচ্ছে মুসলমানদের।’

প্রতিদিন টাইম-এর উদ্ধৃতি দিয়ে যুগশঙ্খর প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামের সমাজজীবনে যখন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশীদের প্রতি ঘৃণা ছেয়ে রয়েছে, তখন মঙ্গলবার দু’দেশের বাণিজ্য সহযোগিতা সম্মেলননে শেখ হাসিনার অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমানের নীতির পাঠ, ‘প্রব্রজনকে (দেশান্তরিত)মানবিক মূল্যবোধ থেকে বিবেচনা করতে হবে। একজন মানুষকে মানুষ হিসাবে গণ্য করা এবং মানুষের মতোই আচারণ করা উচিত। বাংলাদেশী, মিজো ইত্যাদি হিসাবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। কে কোথা থেকে এসেছে, সেটা ভুলে গিয়ে মানুষ হিসাবেই গণ্য করা উচিত।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, সীমান্ত নিয়ে আরো উদার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি (মসিউর রহমান) আরো বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত নির্ধারিত হয়েছে রেডক্লিফ লাইনে। কিন্তু রেডক্লিফ লাইন পুরনো হয়েছে। রেডক্লিফকে এখন বিদায় জানানো উচিত।’

নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নবায়ন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুন্সি বলেন, ‘নাগরিকপঞ্জি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যা বলেছেন, সেটাই আমরা বলব। আমরা মোটেই চিন্তিতনই। ভারতের এক রাজ্য নাগরিকপঞ্জি নবায়ন হচ্ছে, সেটা নিয়ে আমরা কেন চিন্তিত হব?’

বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর ধর্মীয় নির্যাতন নিয়ে তিনি বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষ আমারে দেশ। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি রয়েছে। হাজার হাজার দুর্গাপুঁজা হচ্ছে প্রতিবছর। আমাদের রংপুরে ১৫৬টি দুর্গাপুজা হয়েছে, আমি মণ্ডপে গিয়ে আনন্দ করেছি। গীভর রাত অবধি নাড়ু খেয়ে ঘুরেছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। আমরাও সেটা মানি। তাই সবাই উৎসবে যোগ দেই।’

শেখ হাসিনার অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান দাবি করেন, ‘বাংলাদেশ হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘদিন ধরে আমরা একসঙ্গে বসবাস করছি। তবে সমাজে দু-একজন বদ মানুষ সবখানেই থাকে। তার জন্য গোটা দেশ বা জাতিকে বদনাম করা যায় না। ব্যক্তিগত পর্যায়ের ছোটখাটো সমস্যা সরকারের নীতি বা দেশের পরিস্থিতি বলে বিবেচনা করা যায় না।’

এ সময় সাংবাদিককেই পাল্টা প্রশ্ন করে বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুন্সি বলেন, কিন্তু আপনাদের দেশ থেকে কী খবর পাচ্ছি আমরা। ভারতে মুসলমানরা নিরাপদে নন। সর্বত্র না হলেও কিছু কিছু স্থানে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন হচ্ছে। উত্তর ভারতের নানা স্থানে ওই ধরনের ঘটনা ঘটছে। গো মাংস (গরুর গোশত) খাওয়া নিয়ে নির্যাতন হয়। মুসলমানদের ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করানো হয়। আসলে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকায় কোনো বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটলেও সেটাকে বড় করে দেখানো হয়। কিন্তু সেটা মোটেই হিন্দু নির্যাতন নয়, দাবি করেন তিনি।

এসময় অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশ থেকে আসামে মোটেই দেশান্তরির ঘটনা ঘটছে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা যদি দেখেন, সেটা বুঝবেন। অনেক কাল আগে বাংলাদেশ খেকে দেশান্তরিত হতো, এখন আর হয় না। অর্থনীতিকরা বলছেন, ‘ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থা অনেক উন্নত। তাই কেউ ভাল অবস্থায় রইলে, অর্থনীতি ভাল হলে কেন (ভারতে) আসবেন? তাই বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সেটা সত্য নয়।’

Comments

comments