দেশের বাক স্বাধীনতা কেবল কাগজ কলমের মাঝেই সীমাবদ্ধ; বাস্তরব বড়ই ভয়ানক!

ইফফাত

গত রাত থেকে মনটা ভাল নেই!
দেশ, জাতি নিয়ে আমি খুব বেশি উদ্বিগ্ন। টিভি তেমন দেখাই হয় না। কালে ভদ্রে দেখলেও সংবাদের দিকেই বেশি নজর যায়। কিন্তু গতকাল রাতে ডিবিসি নিউজের দিকে নজর দিতেই দেখি দৈনিক সংগ্রাম অফিসে ভাংচুর চালানোর পর সেখান থেকে লাইভ দেখানো হচ্ছে। অপরাধ? আব্দুল কাদের মোল্লাকে “শহীদ” বলা হয়েছে। কিন্তু এই “শহীদ” বলা তো আজ নতুন কিছু নয়, তাঁকে ফাঁসি দেওয়ার পর থেকেই শহীদ সম্বধোন করে প্রতিবছরই পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে।

যতটুকু জানলাম, সাংবাদিক অঞ্জুন রায় তার ফেসবুক স্টাটাসে দৈনিক সংগ্রামকে নিয়ে একটি উস্কানি মূলক পোস্ট দেন আর সেখান থেকেই এই হামলা-ভাংচুরের ঘটনা ঘটে।

আমরা বরাবরই দেখে আসছি যে, কখনও কোন পত্রিকাতে বিরুদ্ধ মতের কোন কিছু ছাপলে যার বিরুদ্ধে লেখা হয় তিনি তার প্রতিবাদ দেন, সেই প্রতিবাদ সংশ্লিষ্ট পত্রিকাতে না ছাপলেও অন্য কোন পত্রিকাতে ছাপে। কিন্তু কালকের ঘটনা তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। সংবাদের প্রতিবাদ যদি হয় লাঠি দিয়ে, পত্রিকার সম্পাদককে লাঞ্ছিত করে তাহলে আগামিতে এমন ঘটনা দেখার জন্য আমাদের সমকলকেই প্রস্তুত থাকতে হবে।

আমাদের সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদের ২ এর (ক) তে বলা হয়েছে “প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং (খ) সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইলো।”
যেখানে আমাদের পবিত্র সংবিধান সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা দিয়েছে সেখানে পত্রিকা অফিস ভাংচুর করা, তালা লাগোনো, সাংবাদিক ও সম্পাদককে লাঞ্ছিত করা কোন ধরনের স্বাধীনতা তা আমার বুঝে আসে না।

যারা এই ভাংচুরের ঘটনা ঘটালেন তারা কি জানেন দেশের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে কি পড়ানো হচ্ছে? ‘শহীদ’ বলা তো সংশ্লিষ্ট দলের বিষয় কিন্তু সেই স্কুলে পড়ানো হচ্ছে “জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধি, জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’, জাতীয় ফল আম, জাতীয় পাখি ময়ুর, জাতীয় পশু বাঘ, জাতীয় ফুল পদ্ম!” (বাংলাদেশ প্রতিদিন- ১৩ ডিসেম্বর)
যেখানে একটি জাতির ক্ষতি হচ্ছে সেখানে এই হামলাকারিদের কোন খেয়াল নাই আর অঞ্জন রায় কি না কি বললো তা নিয়ে নাচানাচি শুরু হয়ে গেল।

আজকে প্রথম আলো পত্রিকার খবর হলো “মহান মুক্তিযুদ্ধের ২৭১টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও সেখানে স্মৃতি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মানের জন্য দেড় বছর আগে ৪৪২ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের অধীন কোথাও একটা ইটও লাগেনি।”
এই খবর কি চেতনার ধ্বজাধারিদের নজরে পড়ে না, নাকি তারা চোখে কালো চশমা পড়ে আছেন? প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা রাস্তা-ঘাটে মানবেতর জীবন-যাপন করছে আর সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের তথাকথিত চেতনাধারীরা সেই চেতনাকে পুঁজি করে রাজকীয় জীবন যাপন করছে। হায়রে চেতনা!
এই চেতনাধারীরা হয়তো জানেন না যে, দৈনিক সংগ্রামের বার্তা সম্পাদক ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রুহুল আমিন গাজীও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাছাড়া পত্রিকাটির সম্পাদক শ্রদ্ধেয় আবুল আসাদ একজন প্রবিন সাংবাদিক শুধু নন বরং সাংবাদিকদেরও সাংবাদিক। অথচ তাকেই আজতে গ্রেফতার দেখানো হলো। যেখানে গ্রেফতার করার কথা ছিলো হামলাকারিদেরকে সেখানে গ্রেফতার করা হলো যিনি হামলা শিকার তাকেই!
হায়রে মানবতা!
হায়রে চেতনা!

গত ২৬ অক্টোবর প্রথম আলো পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক ও কবি শ্রদ্ধেয় সোহরাব হাসানের একটি লেখার কথা খুব মনে পড়ছে। তাঁর লেখার হেড লাইনটা ছিলো এমন “লি কুয়ান, শেখ হাসিনা ও শুদ্ধি অভিযান”। সেই লেখার একখানে তিনি লিখেছেন “লি কুয়ান সিঙ্গাপুরকে কেবল দূর্নীতিমুক্ত করেননি, উন্নত দেশ হিসেবেও গড়ে তুলেছেন। তাঁর সময়ে দেশটিতে গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত থাকলেও সংবাদমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা ছিল। লি কুয়ান দূর্নীতিবাজদের ধরতে সংবাদমাধ্যমের সহায়তা নিয়েছেন…।”
এজন্যই বোধ হয় তারা উন্নত আর আমরা অবনত!

সর্বশেষ কুরআন থেকেই স্বান্ত্বনা খুজি। আল্লাহ বলেছেনে “প্রকৃত কথা এই যে, সংকীর্ণতার সাথে প্রশস্ততাও রয়েছে। আসলে সংকীর্ণতার সাথে আছে প্রশস্ততাও।” সূরা আলাম নাশরাহ- ৫-৬।

লেখক: ব্লগার

Comments

comments