এবার বাড়ছে বাসাভাড়া, অসহায় ভাড়াটিয়া!

পেঁয়াজের ঝাঁজ এখনও কমেনি। শীতের মৌসুমে পেঁয়াজের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও। এবার তার সাথে যুক্ত হলো বাসাভাড়া। এসব নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে জীবন পার করছেন মধ্যবিত্তরা।

রাজধানীর মতিঝিলে কর্মক্ষেত্র (অফিস) হলেও তুলনামূলক কমে বাসাভাড়া পাওয়ায় মিরপুর শেওড়াপাড়ায় বাসা নিয়েছেন বেসরকারি চাকরিজীবী নাজমুল হক। গত বছরের শুরুতে ১৪ হাজার টাকায় দুই রুমের বাসাভাড়া নেন তিনি।

নাজমুল হক আক্ষেপ করে বলেন, দূরে অফিস তবুও তুলনামূলক কম ভাড়ায় মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় গতবছরের শুরুতে ইউটিলিটি বিল বাদে ১৪ হাজার টাকায় বাসাভাড়া নিয়েছিলাম। গ্যাস, পানি বিদ্যুৎ বিলসহ বাসাভাড়া পড়তো প্রায় ১৬ হাজার টাকা। অথচ বেতন পাই ৩১ হাজার। বেতনের অর্ধেকের বেশিই চলে যাচ্ছে বাড়ি ভাড়ায়। এছাড়া নিজের যাতায়াত খরচ, দুই সন্তান, স্ত্রীসহ সংসারের খরচ আছে। যদি বাসাভাড়া দিতেই বেতনের সিংহভাগ চলে যায় তাহলে পুরো মাস আমাদের মানবেতর জীবন যাপন করা ছাড়া উপায় থাকে না।

নাজমুল হক বলেন, এখানেই শেষ নয়, নতুন বছর উপলক্ষে আরও এক হাজার টাকা বাসাভাড়া বাড়বে বলে নোটিশ দিয়েছে বাড়ির মালিক। ডিসেম্বরে নোটিশ দিয়ে জানিয়েছেন জানুয়ারি থেকে ভাড়া এক হাজার টাকা বাড়ানো হলো। প্রতিবাদ করতে গেছিলাম, কিন্তু বাড়ির মালিক বলেন, ‘আপনার একার জন্য নয় সব ভাড়াটিয়ার জন্যই ভাড়া এক হাজার করে বাড়ানো হয়েছে। যদি আপনার না পোষায় বাসা ছেড়ে দিতে পারেন।’ বাসা চেঞ্জ করা খুবই বিড়াম্বনার কাজ, এছাড়া আমার আয় সীমিত, ভালো বাসা নেয়াও সম্ভব নয়। সে কারণে চুপ থাকা ছাড়া উপায় নেই। আমরা ভাড়াটিয়ারা তো বাড়িওয়ালাদের কাছে জিম্মি।

এ সমস্যা শুধু নাজমুল হকের নয়। রাজধানীতে বাস করা বেশিরভাগ ভাড়াটিয়ারাই এমন সমস্যায় রয়েছেন। যাদের বেতনের অর্ধেকই চলে যাচ্ছে বাড়িভাড়ার পেছনে।

সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু জীবনযাপনের অংশ হিসেবে বাসস্থানের অর্থাৎ বাড়িভাড়া নিয়ে মানসিকভাবে প্রচণ্ড চাপ আর যন্ত্রণার মধ্যে থাকতে হয় ভাড়াটিয়াদের। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ ভাড়াটিয়া ও বাসা মালিক দুপক্ষের জন্য হলেও, সেটি না মানায় বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে ভাড়াটিয়াদের। আর এ প্রবণতা রাজধানী ঢাকাতেই সবচেয়ে বেশি। মাথা গোঁজার ঠাই এবং যাতায়াত সুবিধা ও নিরাপত্তার খাতিরে ভাড়াটিয়ারা মেনে নিচ্ছেন মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতা। তাদের খামখেয়ালি আর বিভিন্ন নিয়মের জেরে ভাড়াটিয়াদের মাসিক আয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে বাড়ি ভাড়ার পেছনে।

কর্মসংস্থানের সিংহভাগ রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় সাধারণ মানুষ কাজের সন্ধানে রাজধানীমুখী হচ্ছেন। প্রতিদিনই কর্মসংস্থান বা ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ঢাকায় আসছেন মানুষ। এক জরিপ মতে, রাজধানী ঢাকায় প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় থাকেন। ভাড়া বাসার এমন চাহিদা দেখে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বাড়িওয়ালারা ভাড়ার বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেন ভাড়াটিয়াদের কাঁধে। জানুয়ারি এলেই ভাড়া বৃদ্ধির খড়গ নামে ভাড়াটিয়াদের উপর। অনেক বাড়িওয়ালাই ইতোমধ্যে ভাড়া বৃদ্ধির নোটিশ দিয়েছেন ভাড়াটিয়াদের। অথচ ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও বাড়ি ভাড়া আইনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট বিধান।

আইনের ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, বড় কোনো ধরনের নির্মাণকাজ বা পরিবর্তন ছাড়া বাসা মালিক দুই বছরের মধ্যে মূল ভাড়া বৃদ্ধি করতে পারবেন না। এ ক্ষেত্রেও হচ্ছে অনিয়ম। দেখা গেছে রাজধানীতে গত ১০ বছর ধরে বাড়ি ভাড়া বেড়েই যাচ্ছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ২০০৭ সালে ঢাকা শহরের ৭৭৫টি এলাকায় ১০টি রাজস্ব আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, কাঁচাবাড়ি, পাকা ঘর, সেমি পাকা, মেইন রোডের তিনশত ফিট ভিতরে এবং বাহিরে পাঁচ টাকা থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত প্রতি স্কয়ার ফিট ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু এটির প্রয়োগ কোথায় দেখা যায় না।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ক সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত ২৫ বছরে নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় রাজধানীতে বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

এ বিষয়ে ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি বাহরানে সুলতান বাহার বলেন, প্রচলিত আইন থাকলেও বাড়ির মালিকরা তা মানেন না। তারা তাদের খেয়াল খুশিমতো প্রতি বছর ভাড়া বাড়ায়। এ ব্যাপারটি ভাড়াটিয়াদের নাভিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। বাড়ি মালিকদের আচরণেও ভাড়াটিয়ারা নাজেহাল হন। বাড়িওয়ালাদের কাছে অসহায় ভাড়াটিয়ারা। এমন সমস্যা সমাধানে আইন ও বিধি যথোপযোগী করে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সমস্যা সমাধানে সিটি কর্পোরেশনকে মনিটরিংয়ের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে। সেই সঙ্গে সরকার বা সিটি কর্পোরেশন নির্ধারিত ভাড়া বাসার প্রতিটি গেটে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। সিটি কর্পোরেশন প্রকৃত ভাড়া জেনে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ ও আদায় করবে।

রাজধানীর মোহাম্মাদপুরের বাসিন্দা রাশেদ আহমেদ বলেন, প্রতিবছর বাসাভাড়া বাড়ানো নিয়মে পরিণত হয়েছে। বছর গেলেই বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর পায়তারা করে। বাড়ি ভাড়ার চাপে আমরা ভাড়াটিয়ারা চ্যাপ্টা। বেতন পাই ৩৮ হাজার যার মধ্যে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত খরচেই চলে প্রায় ২০ হাজার টাকা। যেই বাজারে পেঁয়াজ কিনতে হয় ২৪০ টাকা কেজিতে সেই বাজারে বেতনের অর্ধেক বাড়ি ভাড়াতেই যদি চলে যায় তাহলে খেয়েপরে সংসার চালাবো কিভাবে? আমাদের মত মানুষ তাহলে কিভাবে বাঁচবে?

মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার পর্বতা সেনপাড়া মহল্লার বাড়িওয়াল সিদ্দিকুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পাশাপাশি খরচ প্রতিবছর যেভাবে বাড়ছে তাতে বাসাভাড়া বৃদ্ধি না করলে আমরা কিভাবে চলবো। জীবনের সব আয় দিয়ে একটা বাসা বানানো হয়। আর বাসায় আমাদের আয়ের প্রধান উৎস। যারা চাকরি করেন তাদের তো প্রতিবছরই ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বৃদ্ধি হয়, পাশাপাশি আয় বাড়ে। যেহেতু আমাদের আয়ের মূল উৎস বাড়িভাড়া তাই আমরাও জীবিকার জন্য প্রতিবছর ভাড়া বৃদ্ধি করতে পারি।

বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ভাড়াটিয়াদের বেতনের সিংহভাগই ব্যয় করতে হচ্ছে বাসাভাড়ার পেছনে। তাহলে সেই মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়েপরে কিভাবে বাঁচবে। প্রচলিত আইন থাকলেও বাড়ি মালিকরা তা মানেন না। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ ভাড়াটিয়া ও বাসা মালিক দুপক্ষের জন্য হলেও, সেটি না মানায় বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন ভাড়াটিয়ারা। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ না মানায় বাসা মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে অহরহ। কোন এলাকায় কত বাড়ি ভাড়া হবে, সেটি নির্ধারণের পর মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো উচিত।

তথ্য সূত্র: জাগো নিউজ

Comments

comments