পাঁচ মাসেই লক্ষ্যমাত্রার ৯০ শতাংশ অর্থ ধার করেছে সরকার

কত টাকা ধার করতে হবে, তার একটি লক্ষ্যমাত্রা অর্থবছরের শুরুতেই ঠিক করে রেখেছিল সরকার। কিন্তু পাঁচ মাসেই লক্ষ্যমাত্রার ৯০ শতাংশ অর্থ ধার করা শেষ। আগামী সাত মাসে সরকারি ঋণ কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটাই এখন প্রশ্ন।

এমনিতেই সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। কিন্তু চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) আয় আরও কমেছে, কিন্তু ব্যয় কমেনি। ফলে দেশের ইতিহাসে অল্প সময়ে ব্যাংক থেকে এত বেশি ধার নেওয়ার এমন অভাবনীয় চিত্র এবারই প্রথম দেখা যাচ্ছে।

গত ১০ বছরের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের সবচেয়ে বেশি ধার করার রেকর্ডটি ছিল বিদায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের। পরিমাণ ৩০ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা। আবার ২০১৬-১৭ এবং ২০০৯-১০ অর্থবছরে সরকারকে ব্যাংক থেকে এমনকি ধার নিতেও হয়নি। অথচ গতবার পুরো অর্থবছরে যে ধার করেছিল সরকার, এবার পাঁচ মাস না পেরোতেই তা ছাড়িয়ে গেছে।

এবারের বাজেটে চলতি অর্থবছরের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ধার করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্য থেকে মাত্র পৌনে পাঁচ মাসেই ৪২ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা নিয়ে ফেলেছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ হিসাব গত ২১ নভেম্বর পর্যন্ত।

অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার, আর্থিক বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের এত বেশি ধার নেওয়ার প্রবণতায় চিন্তিত। তাঁদের মতে, আর্থিক খাতের যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণেই এবার এমন পরিস্থিতি হচ্ছে। সাধারণত অর্থবছরের শেষ দিকে সরকারের টাকার টান পড়ে বেশি। সরকারের ধার তখন আরও বাড়বে। অবস্থা এমন দিকে যাচ্ছে যে পুরো অর্থবছর শেষে সরকারের ধারের পরিমাণ এমনকি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সঞ্চয়পত্র বিক্রি কম

মুনাফা বেশি থাকায় মানুষ যে সারি বেঁধে সঞ্চয়পত্র কেনা শুরু করেছিল, তা অনেকটাই কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গেছে ৬৫ শতাংশ। অথচ একই সময়ে রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি মাত্র ২ শতাংশ। ফলে স্বাভাবিক কারণেই সরকারের তহবিলে টান পড়েছে। সুতরাং উপায় হলো ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ধার করা। সরকার এখন সেটাই করছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বাধীনতার পর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের এত বেশি ধার নেওয়ার ঘটনা আর দেখা যায়নি। উচ্চ সুদের হার ও খেলাপি ঋণ জটিলতায় ব্যাংক খাত যখন এমনিতেই বিপদে আছে, তখনই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে উল্টো সরকারের ধার করা বাড়ছে। শুধু এ কারণে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে গোটা অর্থনীতিতে।’

তবে পুরো অর্থবছরের ধার এক লাখ কোটি টাকা হবে কি না, তা তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে বলে জানান আহসান এইচ মনসুর। এগুলো হচ্ছে, অর্থবছর শেষেও যদি রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি খারাপ থাকে, সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ বর্তমান ধারায় চলতে থাকে এবং ব্যাংক খাত থেকে গত পাঁচ মাসের মতোই ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বজায় থাকে।

বেসরকারি খাতে প্রবাহ নিয়ে আহসান এইচ মনসুরের কথার সত্যতা পাওয়া যায় গত অক্টোবরের বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের চিত্রের দিকে তাকালে। এই মাসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছেছে।

তবে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গেলেও একদিক থেকে সরকারের কিছুটা উপকার হচ্ছে। কারণ, সঞ্চয়পত্র বেশি বিক্রি হলে গ্রাহকদের উচ্চ হারে মুনাফা বা সুদ দিতে হয় বলে সরকারের ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এ থেকে কিছুটা রেহাই মিলবে। তবে এর পরিবর্তে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলে সমস্যায় পড়বে বেসরকারি খাত। তখন ঋণে তাদের ভাগ কমে যাবে। এতে ব্যাহত হবে বিনিয়োগ।

পুরো বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গত বৃহস্পতিবার অর্থসচিব আবদুর রউফ তালুকদারের কার্যালয়ে গেলেও এ নিয়ে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি নন বলে প্রথম আলোকে জানান তাঁর একান্ত সচিব মো. হেলাল উদ্দিন।

চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা ধরা হয়েছে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা। বাকি ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ঘাটতি (অনুদান বাদে)। এ ঘাটতিরই একটি অংশ সরকার পূরণ করছে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ধার করে।

বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক সরকারের ধার নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারি তথ্য-উপাত্তেই দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ধার নেওয়া বাড়ছে। বিষয়টি ব্যাংক খাতের বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার ক্ষমতাকে সংকুচিত করবে। ইতিমধ্যেই তার প্রমাণ দেখা যাচ্ছে।’

অর্থনীতির অন্য সূচকও নেতিবাচক

শুধু ব্যাংক থেকে সরকারের ধার নয়, অন্য সূচকগুলোও অর্থনীতির খুব পক্ষে নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ, আর জুলাই-নভেম্বর সময়ে রপ্তানি কমেছে ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এই সময়ে রাজস্ব আয় বেড়েছে আগের বারের ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশের পরিবর্তে ২ দশমিক ৬২ শতাংশ।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ঋণপত্র (এলসি) খোলা ও নিষ্পত্তির সর্বশেষ চিত্র রয়েছে জুলাই-আগস্ট দুই মাসের। এই দুই মাসে এলসি খোলা কমেছে ৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ আর নিষ্পত্তি কমেছে ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এই সময়ে শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলা কমেছে ১৯ শতাংশ এবং এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ।

হা-মীম গ্রুপের কর্ণধার এ কে আজাদ এ পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি বেসরকারি খাতনির্ভর। চলতি অর্থবছরের প্রায় অর্ধেক শেষ হতে চলল। এই সময়ে রপ্তানিতে শুধু শ্লথগতি আসেনি, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও কমে গেছে। এরই মধ্যে যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া বাড়তে থাকে, এই ঘটনা তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ভোগান্তির কারণ হবে।’ পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজস্ব আদায়ে গতি বৃদ্ধির পরামর্শ দেন তিনি।

ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা শঙ্কায়

ব্যাংকাররা বলছেন, সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার চাপে রয়েছে পুরো ব্যাংক খাত। অর্থনীতির অন্য সূচকের খারাপ অবস্থার চাপও ব্যাংক খাতে রয়েছে। ঠিক এমন এক সময় খরচ মেটাতে সরকার এসে ভর করছে ব্যাংক খাতের ওপর।

বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, চলতি অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার অর্জনের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ বেশি নেওয়ার প্রবণতাটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিজ্ঞতা অনুযায়ী বলা যায়, অর্থবছরের শেষ দিকে সরকারের টাকার দরকার পড়ে বেশি। এখন পর্যন্ত যে টাকা ব্যাংক থেকে সরকার নিয়েছে, তাতে খুব একটা সমস্যা হয়নি। তবে এটা চলতে থাকলে অবশ্যই চিন্তার বিষয়।’

Comments

comments