মহান বিজয় দিবস আজ

আজ ১৬ ডিসেম্বর। আমাদের মহান বিজয় দিবস। বিজয়ের ৪৮ বছর পূর্ণ হলো আজ। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে লাখো প্রাণের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের আজকের দিনে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা।

জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সাথে স্মরণ করবে সেইসব শহীদদের যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা। স্মরণ করবে সেইসব বীর সেনানীদের যারা শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে অনাগত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ উপহার দেয়ার জন্য প্রাণের মায়া ত্যাগ করে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যেসব নরনারীর সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সম্মান জানানো হবে।

যথাযোগ্য মর্যদায় দিবসটি পালনের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি উদযাপনের সর্বাত্মক প্রস্ততি নেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আজ সরকারি ছুটির দিন।

রাষ্ট্রপতির বাণী
রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও চেতনা বাস্তবায়নে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আরো বেশি অবদান রেখে দেশ ও জাতিকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার আহবান জানিয়েছেন। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে গতকাল এক বাণীতে তিনি এ আহবান জানান।

রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাধীনতা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। এ অর্জনের পেছনে রয়েছে, শোষণ-বঞ্চনার পাশপাশি রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। তিনি বলেন, ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারোর সাথে বৈরীতা নয়’ বঙ্গবন্ধু ঘোষিত এ মূলমন্ত্রকে ধারণ করে দেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হচ্ছে। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত ও নির্যাতিত লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিশ্বাসী। তিনি এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রহণের জন্য মিয়ানমারসহ জাতিসঙ্ঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও ২০২১ সালে মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সাড়ম্বরে উদযাপিত হবে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ দুটি অনুষ্ঠানই বাঙালি জাতির ইতিহাসে অনন্য মাইলফলক। দলমতনির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠান দুটির উদযাপনে নতুন মাত্রা যোগ করবে। লাখো শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রিয় মাতৃভূমি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হোক, মহান বিজয় দিবসে রাষ্ট্রপতি এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

প্রধানমন্ত্রীর বাণী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণতন্ত্র ও সরকার বিরোধী সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। বাসস।

তিনি বলেছেন, ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে দেশ, গণতন্ত্র ও সরকার বিরোধী সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের এই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এ বিজয় দিবসে সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী আজ মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আজ দেয়া এক বাণীতে এ আহ্বান জানান। তিনি গভীর শ্রদ্ধার সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, ত্রিশ লাখ শহীদ, সম্ভ্রমহারা দুই লাখ মা-বোন এবং জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, কাল ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির এক অনন্য গৌরবোজ্জ্বল দিন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি দীর্ঘ তেইশ বছর রাজনৈতিক সংগ্রাম ও নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের এই দিনে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ৪৯তম মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে তিনি দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বের পাঁচটি দেশের একটি; উন্নয়নের ‘রোল মডেল’। আমরাই বিশ্বে প্রথম শত বছরের ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ বাস্তবায়ন শুরু করেছি। আমাদের বর্তমান জিডিপি প্রবৃদ্ধি আট দশমিক ১৩ শতাংশ, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দেশে দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ২১ ভাগ। আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৯০৯ মার্কিন ডলারে, শিক্ষার হার ৭৩ দশমিক নয় শতাংশ। দেশের ৯৫ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছেন। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে ৭২ বছর হয়েছে। পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, বিআরটি, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ সড়ক, রেল, নৌযোগাযোগ ক্ষেত্রে ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বিএনপির শুভেচ্ছা
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে দেশে-বিদেশের সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বাণীতে বলা হয়- আজকের এ দিনে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সেসব নির্ভিক বীর শহীদদের কথা, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন মাতৃভূমি পেয়েছি। স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করি। পরাধীনতার হাত থেকে দেশের বিজয় অর্জনে যেসব মা-বোন সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন- তাদের জানাই সশ্রদ্ধ সালাম। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ডাকে শুরু হওয়া স্বাধীনতাযুদ্ধ ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে দেশের অকুতোভয় বীর মুক্তি যোদ্ধারা বিজয়ী হয়। তাই ১৬ ডিসেম্বর আমাদের গর্বিত এবং মহিমান্বিত বিজয় দিবস। এদেশের দামাল ছেলেরা হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ছিনিয়ে এনেছিলো স্বাধীনতার সূর্য। আজকের এ মহান দিনে সেসব বীর সেনাদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানাই।

বাণীতে বলা হয়- দীর্ঘ পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে ১৯৭১ সালের এদিনে আমরা প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে সক্ষম হই। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ অর্জন। গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়েই আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছিলাম। সে লক্ষ্য পূরণে আমরা আজো কাজ করে যাচ্ছি। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবো বলে বিশ্বাস করি। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগ্রামে আপসহীন নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে কারান্তরীণ করে রাখা হয়েছে। এখন তাকে জামিন দিতে সরকার বাধা দিচ্ছে। তার মুক্তির জন্য আমাদের সকলকে সম্মিলিতভাবে আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার বিকল্প নেই। বিজয়ের এ দিনে আমি দেশ ও জাতির কল্যাণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহবান জানাচ্ছি।

Comments

comments