ফ্যাসিবাদ বাঁচাতে নূরদের মেরে ফেলুন

ভিপি নুর

সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্মে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে নূর, রাশেদ থেকে শুরু করে বহু সাধারণ শিক্ষার্থীকে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে কখনও তাদের বানানো হয়েছে শিবির। কখনও জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তাদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে গালি দেয়া হয়েছে। আবার কখনও তাদের ফাঁসাতে ভিসির বাড়িতে ভাংচুর অগ্নিসংযোগ করে সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করে মামলা দিয়ে সেই মামালায় কারাগারেও পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ এবং ছাত্রলীগের গুন্ডাদের দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বুকে চালানো হয়েছে গুলি। আবার কখনও ওপাড়ের দাদাবাবুদের গোপন বাহিনীকে ব্যবহার করে ছাত্রনেতাদের গুম করে মেধাবী শিক্ষার্থী ওয়ালী-মোকাদ্দাসের মত চিরতরে মিটিয়ে দেয়ার চেষ্টাও করা হয়েছে।

শুধুমাত্র ভিন্নমত পোষণ ও ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের গুন্ডামির বিরোধিতা করায় প্রশাসন ও মিডিয়ার সামনে বেঘোরে পেটানো হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। কিন্তু সবাই কেমন যেন নীরব, নির্বিকার। কারো মুখে রা শব্দটিও নেই। নির্মমতা দেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ আহা উহু করলেও, কার্যত এসব মজলুমদের পাশ দাঁড়াচ্ছে না কেউই।

কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? সন্ত্রাসী গুন্ডারা কোথায় পাচ্ছে এত সাহস? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জায়গায় কেন কেউ ভিন্নমত পোষণ করতে পারছে না? কেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা এসব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারছে না? কেন ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা কাউকে সন্দেহ করলেই তাকে ‘গেস্টরুম’ নামক জল্লাদখানায় যেতে হয়? কেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোত অস্ত্র ও মাদকের সয়লাব?

আমরা কেউ কি এসবের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি? কেউ কি জানতে চেয়েছি, ভিন্নমত পোষণ করলেই শিবির আখ্যা দিয়ে কেন কাউকে মেরে ফেলা যায়? করিনি। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শুধুমাত্র ভিন্ন মত ব্যক্ত করে বক্তব্য দেয়ায় যেদিন মেধাবি ছাত্র আব্দুল মালেককে তোফায়েল-মেননরা পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল, সেদিন কেউ রুখে দাঁড়ালে এই সন্ত্রাসীরা এত আস্পর্ধা পেত না। যেদিন মেধাবি শিক্ষার্থী আবু বকরকে মেরে ফেলা হলো, সেদিনও যদি কেউ এই সন্ত্রাসীদের রুখে দাঁড়াতো, তবে আজকে এই দৃশ্যের জন্ম হতো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত মুসলিম চেতনার স্মারকে দাঁড়িয়ে পরিবেশ পরিষদের নামে ধর্মবিদ্বেষী ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয় না হলে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফ্যাসিবাদের উগ্রবাদী শ্লোগানে থর থর করে কাঁপতো না। হাজারো ধর্মপ্রাণ শিক্ষার্থীদের শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে ক্যাম্পাস ছাড়তে হতো না।

আজ ফ্যাসিবাদের এ পৈশাচিক উল্লাস প্রমাণ করে, ভিন্ন রাজনৈতিক মত পোষণের কারণে অন্যায়ভাবে একশ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মারধর এমনকি হত্যার লাইসেন্স দিয়ে আমরা পুরো ছাত্রসমাজকে একদল খুনী, লুটেরা, ডাকাতের হাতে তুলে দিয়েছি। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে পুরো জাতিকে যুগের পর যুগ শোষণ করে চলেছে। আর একশ্রেণির মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী এসব ডাকাতদের বাহবা দিয়ে প্রতিনিয়ত উস্কে দিচ্ছে।

গত ১৩ ডিসেম্বরের কথাই ধরুন। ‘খাড়াইয়া যামু, বসাইয়া দেবেন’ টাইপের বিতর্কিত বিচারের মাধ্যমে হত্যা করা হয় জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লাকে। ইচ্ছে মত আইন তৈরি করে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করার সুযোগ নেয়। যা ইতিহাসে নজিরবিহীন। অ্যাটর্নী জেনারেলের মতকে প্রাধান্য দিয়ে রিভিউয়ের সুযোগ না দিয়ে তড়িঘড়ি করে হত্যা করা হয় আব্দুল কাদের মোল্লাকে। কসাই কাদেরের অপকর্মের দায় চাপানো হয় তার উপর। অন্য একজন নারীকে বোরখা পরিয়ে মুখ ঢেকে এনে নকল মোমেনা বেগম সাজিয়ে মিথ্যা সাক্ষীর বন্দোবস্ত করা হয়। মিথ্যা সাক্ষীর প্রাণবন্ত উপস্থাপন নিশ্চিত করতে ‘সেফ হাউজ’ নামে ডিজিটাল কাশিপুর গড়ে তোলা হয়।

এত এত জুলুমের শিকার হয়ে যে ব্যক্তি নিহত হলেন, তাকে ‘শহীদ’ বলে সংবাদের শিরোনাম লেখায় নাকি একশ্রণী সাংবাদিকের নাক কাটা গিয়েছে। ফল স্বরূপ বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পত্রিকা দৈনিক সংগ্রামের প্রধান কার্যালয়ে পুলিশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তান্ডবলীলা চালানো হয়। শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয় দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক আবুল আসাদকে। নিজ কক্ষ থেকে টেনে হিঁচড়ে তাকে রাস্তায় নামিয়ে আনা হয়। আর এসব দৃশ্য কোনো কোনো মিডিয়া বেশ তৃপ্তির সাথে প্রচার করে।

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ নামের যে ডাকাত দলকে অশীতিপর  আবুল আসাদের উপর হামলা করায় যারা সেদিন হিরো বানিয়েছিল, ভিপি নূর আর তার সঙ্গীদের উপর আজ তারাই প্রবল উচ্ছাসে পৈশাচিক হামলা চালিয়েছে। এ হামলার সাথে শুধু ছাত্রলীগ, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চই জড়িত না, এর সাথে সমানভাবে মিডিয়ার একশ্রণির হাড্ডিলোভি সারমেয়রাও জড়িত।

ভিন্নমতাবলম্বীদের উপর এ বাকশালী তান্ডবের পেছনে আমাদের সীমাহীন কমজোরি, ভীরুতা ও কাপুরুষতাও দায়ী। ফ্যাসিবাদের এ নির্বিঘ্ন উত্থান এ দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে এখন আমরা কেউই তা জানিনা। পুরো জাতি আজ হায়েনার তান্ডবে হতবিহ্বল। এমন পরিস্থিতিতে দেশের গণমাধ্যমগুলোকে শুধু এতটুকুই বলবো- ফ্যাসিবাদ বাঁচাতে নূরদের মেরে ফেলুন।

লেখক: হাসান রূহী

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Comments

comments