ওবায়দুল কাদেরের হাতে এই দামী ঘড়ির উৎস কি?

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। নির্বাচন কমিশনে কাদেরের নিজের দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ীই ২০০৮/২০০৯ সালে তার বিরুদ্ধে অন্তত ছয়টি দুর্নীতির মামলা চলমান ছিলো। এই মামলাগুলো হয়েছিলো মূলত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আদালতে মামলাগুলো বাতিল হয়ে যায়। এতো বছর পরে এই প্রভাবশালী মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আবার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, আর এই অভিযোগে নতুনত্বও আছে বটে।

ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে নেত্র নিউজের সাথে যোগাযোগ করেছেন একজন হুইসেলব্লোয়ার। তিনি দাবি করছেন যে উৎকোচ হিসেবে বিশ্ব-বিখ্যাত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দামী হাতঘড়ি উপহার পেতে পছন্দ করেন কাদের। মোটা অংকের একটি কন্ট্রাক্ট পাশ করে দেয়ার বিনিময়ে মন্ত্রী কাদের বিলাসবহুল একটি ব্র্যান্ডের খুবই দামী একটি হাতঘড়ি উৎকোচ হিসেবে নিয়েছেন এমন একটি লেনদেন খুবই কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন এই অভিযোগকারী। অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে তিনি আমাদের ঘড়িটির বিশেষ সিরিয়াল নাম্বারসহ ছবি ও এই ঘড়ির আসল উৎস সংক্রান্ত দলিলও দেখিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠকে ওবায়দুল কাদের ঘড়িটি পরে আছেন এমন ছবিও এই হুইসেলব্লোয়ার আমাদের দেখাতে সক্ষম হোন। তিনি আরও দাবি করেন যে ওবায়দুল কাদেরের “মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করা” লোকজনের কাছে, বিশেষ করে দেশী-বিদেশী ঠিকাদারদের কাছে, মন্ত্রীর এই হাতঘড়ির লোভ একটি “ওপেন সিক্রেট”।

এই হুইসেলব্লোয়ারের সাথে নেত্র নিউজের সমঝোতা অনুযায়ী এবং আমাদের এই সংবাদ সূত্রের গোপনীয়তা রক্ষার্থে আমরা উল্লিখিত হাতঘড়িটির বা উক্ত লেনদেনের ব্যাপারে বিস্তারিত কোন তথ্য প্রকাশ করতে পারছেনা বলে ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়।

তবে, এই হুইসেলব্লোয়ারের অভিযোগটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়েই আমরা ওবায়দুল কাদেরের দামী হাতঘড়ির এক চমকপ্রদ সংগ্রহের সন্ধান পেয়েছি। এই ঘড়িগুলো, যার এক একটির মূল্য কয়েক লক্ষ টাকা, এতোদিন আমাদের চোখের সামনেই ছিলো। কেতাদুরস্ত পোশাক পরে ওবায়দুল কাদের যে তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে প্রোফাইলে নিয়মিত ছবি পোস্ট করেন সেখান থেকেই তার হাতঘড়ি পরা কয়েকশ ছবি আমরা সংগ্রহ করি।

সংগৃহিত ছবিগুলো থেকে দামী ব্র্যান্ডের হাতঘড়িগুলো খুঁজে বের করতে আমরা সাহায্য নেই ঘড়ি বিশেষজ্ঞ, ঘড়ি সংগ্রাহক আর রেডিটে হাতঘড়ি সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রূপের সদস্যদের। দামী অলংকারের বাজার হিসেবে প্রসিদ্ধ লন্ডনের হ্যাটন গার্ডেনের হাতঘড়ির দোকানদারদের সাথেও আমরা কথা বলি। এই বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় আমরা ওবায়দুল কাদেরের কব্জিতে শোভা পাওয়া কয়েকটি ঘড়ি মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই চিহ্নিত করতে সক্ষম হই। রোলেক্স, উলিস নাদা আর লুই ভিতন ব্র্যান্ডের এই ঘড়িগুলোর সর্বমোট মূল্য কোটি টাকারও বেশি।

ওবায়দুল কাদেরের এই ঘড়িটির সাথে সাদৃশ্য আছে রোলেক্স ডে ডেট প্রেসিডেন্ট ঘড়ির, দাম ২৮,৮৬,০০০ টাকা। লুই ভিতন জিএমটি ভয়েজার (পিঙ্ক গোল্ড সংস্করণ), দাম ১২,৭২,০০০ টাকা।

ওবায়দুল কাদেরের হাতে যে ঘড়িটি দেখা যাচ্ছে তার সাথে সাদৃশ্য আছে লুই ভিতন তাম্বো স্পিন টাইম রিগাতা ঘড়ির একটি বিশেষ মডেলের যেটি অনলি ওয়াচ ২০১৩ নামক চ্যারেটি নিলামে ৪০,০০০ ইউরোতে (৩৭,৩১,৫০০ টাকা) বিক্রি হয়েছিলো। অনলি ওয়াচের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে তাদের নিলামে অংশগ্রহণকারীদের কোন রেকর্ড তারা সংরক্ষণ করেননা।

ওবায়দুল কাদের তার নিজের টাকা দিয়েই এই হাতঘড়িগুলো কিনেছেন এমনটি অবশ্যই হতে পারে, কিন্তু তার আয়ের যে হিসাব আর সম্পদের যে বিবরণ আমরা সংগ্রহ করেছি তাতে হিসাব ঠিক মিলছে না।

বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনে মন্ত্রী কাদের ২০১৮ সালে যে হলফনামা দাখিল করেছেন সেখানে তিনি তার আয়কর সনদও জুড়ে দিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে তার মোট বাৎসরিক যায় ছিলো ৩১,১৭,৬৫১ টাকা। আর মধ্যে ১২,৬০,০০০ টাকা তিনি মন্ত্রীর বেতন-ভাতা হিসেবে পেয়েছেন আর ৪,৮৯,৬৫১ টাকা পেয়েছেন বই লেখার রয়্যালটি বাবদ। অন্যদিকে তার একটি রোলেক্স ডে ডেট ঘড়ির দামই ২৮,৮৬,০০০ টাকা। আবার, তার দাখিল করা হলফনামা বা আয়কর সনদে এই দামী হাতঘড়িটির বা অন্যান্য ঘড়িগুলোর কোন উল্লেখই নেই, যা নির্বাচনী বিধিমালা আর আয়কর আইনের লংঘন বটে।

রোলেক্স ডেটজাস্ট, দাম ৯,৩৩,০০০ টাকা। লুই ভিতন তাম্বো স্পিন টাইম রিগাতা ঘড়ির একটি বিশেষ মডেলের যেটি অনলি ওয়াচ ২০১৩ নামক চ্যারেটি নিলামে ৪০,০০০ ইউরো

ওবায়দুল কাদেরের হাতে যে ঘড়িটি দেখা যাচ্ছে তার সাথে সাদৃশ্য আছে লুই ভিতন তাম্বো স্পিন টাইম রিগাতা ঘড়ির একটি বিশেষ মডেলের যেটি অনলি ওয়াচ ২০১৩ নামক চ্যারেটি নিলামে ৪০,০০০ ইউরোতে (৩৭,৩১,৫০০ টাকা) বিক্রি হয়েছিলো। অনলি ওয়াচের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে তাদের নিলামে অংশগ্রহণকারীদের কোন রেকর্ড তারা সংরক্ষণ করেননা।

ওবায়দুল কাদেরের হাতঘড়িগুলো নকল বা রেপ্লিকা কিনা সেটাও আমরা যাচাই করার চেষ্টা করেছি। এই ব্যপারে আমরা কথা বলেছি নকল ঘড়ির বিষয়ে ওয়াকিবহাল এমন একজন বিশেষজ্ঞের সাথে যার রেপ্লিকা ঘড়ির ব্যবসাও আছে। তিনি আমাদের জানিয়েছেন যে কাদেরের হাতঘড়িগুলোর মধ্যে কয়েকটি নকল বা রেপ্লিকা হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায়না। তবে তার সবচেয়ে দামী হাতঘড়িগুলো নকল বা রেপ্লিকা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম কারণ এগুলো বেশ নতুন মডেলের যা এখনও রেপ্লিকা হয়নি। আবার তার কয়েকটি ঘড়ি এমন যে সেগুলোর রেপ্লিকার দামও কয়েক হাজার মার্কিন ডলার।

রোলেক্স সেলিনি (হোয়াইট গোল্ড), দাম ৯,৩৩,০০০ টাকা। উলিস নাদা এক্সেকিউটিভ ডুয়াল টাইম, দাম ১০,১৬,২০০ টাকা।

বিশ্ব-বিখ্যাত ব্র্যান্ডের দামী এই হাতঘড়িগুলোর ব্যাপারে ওবায়দুল কাদেরের নিজের ব্যাখ্যা জানতে ও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগের ব্যপারে তার বক্তব্য জানতে আমরা তার কাছে একটি প্রশ্নমালা পাঠাই তার জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে। কিন্তু এখনও আমরা তার কাছ থেকে কোন জবাব পাইনি।

বেশ কিছুদিন ধরেই ওবায়দুল কাদের দুর্নীতির ব্যপারে উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সদ্যঘোষিত দুর্নীতি-বিরোধী অভিযানের একজন পৃষ্ঠপোষক হিসেবে। অক্টবর মাসের প্রথম দিকেই এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “আমাদের দলের ও সরকারের কোনো মন্ত্রী ও এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের খোঁজ পেলে আপনারা তা লিখুন, তুলে ধরুন। আমাদের তথ্য দিন। আমরা অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব।” সেই সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী কাদেরের কব্জিতে ঠিক কোন ঘড়িটি শোভা পাচ্ছিলো সেটি আমরা এখনও চিহ্নিত করতে পারিনি।

Comments

comments