বিশ্ব ইজতেমা: ৯ জনের মৃত্যু, আখেরি মোনাজাত আজ

সর্বশেষ হেদায়েতি বয়ান ও আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে আজ রবিবার শেষ হচ্ছে তাবলিগ জামাতের উদ্যোগে আয়োজিত ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। দুপুর ১২টার পর থেকে জোহরের নামাজের আগে যেকোনো সময় আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে ইজতেমা সূত্র। আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন তাবলিগ জামাতের শীর্ষ বুজুর্গ ও কাকরাইল মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ যোবায়ের।

বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে আগামী ১৭ জানুয়ারি। এ পর্বের আয়োজক বিশ্ব তাবলিগ জামাতের সাবেক আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীরা।

তাবলিগ জামাতের বিবদমান দুই পক্ষের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উভয় পক্ষকে পৃথকভাবে ভিন্ন সময়ে দুই পর্বে বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। মাওলানা যোবায়ের অনুসারীরা আমলি শুরার তত্ত্বাবধানে বিশ্ব ইজতেমার যাবতীয় প্রস্তুতিকাজ সম্পন্ন করেন। অন্যদিকে মাওলানা সাদ কান্ধলভী অনুসারীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় মোনাজাতের পর সব অবকাঠামো খুলে তা সংরক্ষণ করার।

গত বছর থেকে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন এভাবেই চলছে। এর আগে বিভিন্ন দেশের মেহমানদের অংশগ্রহণে ৩২ জেলা করে দুই পর্বে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হতো। তাবলিগ জামাতের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে বিশ্ব ইজতেমায় বিদেশি মেহমানদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে দুই ভাগ হয়ে গেছে।

এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে ৫১টি দেশের প্রায় তিন হাজার প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন বলে আয়োজক সূত্র জানায়। ইজতেমার দ্বিতীয় দিন গতকাল শনিবার তাবলিগের ছয় উসুলের আলোকে কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা সংবলিত আমবয়ান পেশ করেন দেশ-বিদেশের বুজুর্গ মুরব্বিরা।

নজিরবিহীন কড়া নিরাপত্তায় এবারের ইজতেমা ছিল অত্যন্ত শান্ত ও সুশৃঙ্খল। প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল অনুকূল। গত দুই দিন শীত ও ঠাণ্ডা বাতাস থাকলেও বৃষ্টিপাত হয়নি।

প্রথম পর্বে আগের বছরগুলোর চেয়ে এবার মুসল্লির সংখ্যা অনেক বেশি হয়েছে। যদিও এবার প্যান্ডেলের আয়তন বাড়িয়ে খেত্তার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রথম দিনই তুরাগ নদের দুই তীরের শামিয়ানা পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন জেলা থেকে আসা জামাতবদ্ধ মুসল্লিরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, কামারপাড়া সড়ক, হোন্ডা সড়কসহ আশপাশের রাস্তায় ঠাঁই নিয়েছেন।

গত তিন দিন বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে দেশ-বিদেশের তাবলিগি মুরব্বিরা এশার নামাজ বাদ ছাড়া চার নামাজের পর ঈমান, আমল, আখলাক ও দ্বিনের মেহনত সম্পর্কে আম ও খাসবয়ান করেন। বয়ানে মুরব্বিরা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ, ইমানের পরীক্ষা, তাকওয়া অর্জনের পথ, কামিয়াবি হাসিল, জাহান্নামের শাস্তি থেকে পরিত্রাণের উপায়, দুনিয়াবি শাস্তি, আখেরাতের কামাই ও দাওয়াতে তাবলিগের গুরুত্ব সম্পর্কে উর্দু ভাষায় বয়ান করেন। এ সময় বিভিন্ন দেশের মেহমানদের বোঝার সুবিধার্থে তাত্ক্ষণিক বয়ান বাংলা, ইংরেজি, আরবি, তামিল, চৈনিক, মালয়সহ বেশ কিছু ভাষায় অনুবাদ করে শোনানো হয়। ময়দানের বিভিন্ন স্থানে তাশকিল কামরা ও কাবুওয়ালি জামাত কক্ষে ছোট ছোট আয়োজনে পেশাভিত্তিক খাসবয়ান অনুষ্ঠিত হয়।

আখেরি মোনাজাতের প্রস্তুতি :

প্রতিবছর বিশ্ব ইজতেমার তিন দিনের কর্মসূচিতে যতসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে এর প্রায় দ্বিগুণ লোকের সমাগম ঘটে আখেরি মোনাজাতে। মোনাজাতে অংশ নিতে এরই মধ্যে টঙ্গীর প্রতিটি বাড়িঘর, কলকারখানা, কলোনি ও আশপাশের গ্রামগুলোতে আত্মীয়-স্বজন এসে হাজির হয়েছেন। আজ ফজরের নামাজের আগেই সবাই অজু-গোসল সেরে পায়জামা, পাঞ্জাবি, টুপি, লুঙ্গি পরে ও আতর মেখে রওনা দেবেন ইজতেমা মাঠের দিকে। মোনাজাত শেষে বাড়ি ফিরে আসতে সময় লেগে যাবে কয়েক ঘণ্টা। তাই তো প্রতিবছরের মতো এবারও সবাই আগের দিন বিশেষ বাজার করে রান্নাবান্নার কাজ শেষ করে রেখেছেন।

আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে আগতদের অর্ধেকেরই ঠাঁই হয় মহাসড়ক, অলিগলি ও বিভিন্ন ভবনের ছাদে। আর তাই হোগলাপাটি ও মাদুর এমনকি পুরনো খবরের কাগজেরও চাহিদা বেড়ে যায়। গতকাল থেকেই এসব সামগ্রী জোগান দেওয়ার জন্য খুদে ব্যবসায়ীরা তৎপর হয়ে উঠেছেন। আখেরি মোনাজাতে অংশগ্রহণকারীদের তৃষ্ণা মেটাতে কিছু সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান বিনা মূল্য খাবার পানির ব্যবস্থা নিয়েছে। এ ছাড়া টঙ্গী-গাজীপুর এলাকার প্রায় সব সড়কের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে নাশতার হোটেল। আজ ভোরে হোটেলগুলোতে বিরিয়ানি ও পরোটা ভাজির প্যাকেজ চালু হবে বলে জানান বেশ কয়েকজন। হেটেলগুলোতে নাশতা তৈরির কাজ শুরু হয় রাত ১১টার পর থেকেই। আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে টঙ্গী ও গাজীপুরের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান আজ বন্ধ থাকবে।

বন্ধ থাকছে যেসব সড়ক:

ভোর ৫ টা থেকে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর, চৌরাস্তা, মিরেরবাজার-টঙ্গী, আবদুল্লাপুর থেকে বাইপাস সড়কে আশুলিয়া পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ থাকবে। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আনোয়ার হোসেন এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ইজতেমায় অংশ নেয়া কয়েক লাখ মুসল্লির ছাড়াও আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে ইচ্ছুক অসংখ্য মুসল্লির যাতায়াতের সুবিধার্থে ভোর ৫টা থেকে বিমান বন্দর- গাজীপুরের জয়দেবপুর, চৌরাস্তা, মিরেরবাজার-টঙ্গী, আবদুল্লাপুর থেকে বাইপাস সড়কে আশুলিয়ায় ব্যারিকেড দিয়ে ইজতেমাসংলগ্ন এলাকায় যান চলাচল বন্ধ রাখা হবে। পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, ইজতেমা শেষে যাওয়ার সময় একই ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকবে।

৯ মুসল্লির মৃত্যু :

ইজতেমার প্রথম দিন মারা গেছেন ৩ জন। শুক্রবার বিকাল থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ইজতেমায় আগত আরও পাঁচ মুসল্লির মৃত্যু হয়। মুসল্লি বার্ধক্যজনিত কারণ ও হৃদেরাগে আক্রান্ত, অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে তারা মারা গেছেন বলে জানা যায়। তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন, আব্দুর রাজ্জাক (৬৫) রাজশাহী, আব্দুল তমিজ (৬৫) কুমিল্লা, মোহাম্মদ শাহজাহান (৬২) ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আলী আজগর (৭০) বরিশাল ও ইউনুস আলী (৪৫) ময়মনসিংহ। এছাড়া বাকিদের নাম জানা যায়নি।

যৌতুকবিহীন বিয়ে সম্পন্ন:

বিশ্ব ইজতেমার অন্যতম আকর্ষণ ছিল যৌতুক বিহীন বিয়ের অনুষ্ঠান। সম্পূর্ণ শরীয়ত মেনে তাবলিগের রেওয়াজ অনুযায়ি মঞ্চের পাশেই বসে যৌতুকবিহীন বিয়ের আসর। বর ও কনের সম্মতিতে উভয় পক্ষের লোকজনের উপস্থিতিতে ১০১টি বিয়ে সম্পন্ন হয়। ।

ইজতেমা শুরুর আগের দিন থেকেই অভিভাবকরা বর ও কনের নাম তালিকাভুক্ত করেন। বিয়ের পর মূল বয়ান মঞ্চ থেকে মোনাজাতের মাধ্যমে নব দম্পতিদের সুখ-সমৃদ্ধ জীবন কামনা করা হয় এবং মঞ্চের আশে-পাশের মুসল্লিদের খোরমা ও খেজুর দিয়ে মিষ্টিমুখ করানো হয়। বিয়েতে মোহরানা ধার্য করা হয় ‘মোহর ফাতেমী’র নিয়মানুযায়ী। এ নিয়ম অনুযায়ী মোহরানার পরিমান ধরা হয় দেড়’শ তোলা রুপা বা এর সমমূল্য অর্থ (১ লাখ ৫হাজার টাকা)।

কঠোর নিরাপত্তা :

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আনোয়ার হোসেন জানান, বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক নিরাপত্তা আগের মতোই বহাল থাকবে। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মুসল্লিরা যাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন, সে ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসন বিশেষভাবে প্রস্তুত রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা পরবর্তী ইজতেমায় দায়িত্ব পালনের জন্য টঙ্গীতেই অবস্থান করবেন।

Comments

comments