ভাইরাসের ভয়াবহতাকে চেপে যেতে চেয়েছিল চীন!

নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের তথ্য প্রথমদিকে আড়াল করতে চেয়েছিল চীন। এমনটি মানুষের অসুস্থতার খবর যাতে প্রকাশ না পায় সেজন্য আরোপ করা হয়েছিল নিয়ন্ত্রণ। স্রেফ গুজব বলে উড়িয়ে দিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল চীন করকার। গ্রেপ্তারও করা হয় কয়েকজনকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্য না লুকিয়ে মানুষকে শুরুতেই সচেতন করা হলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না। ভাইরাসটি সম্পর্কে মানুষের অসচেতনতা এবং প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলায় ব্যর্থতার জন্য এখন কাঠগড়ায় চীনের সরকার।

অন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বলছে, চীনের কমিউনিস্ট সরকার শুরুতে নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে ‘মারাত্নক কিছু নয়’ এবং ‘গুজব’ বলে অভিহিত করেছিল। ভাইরাসটি উহানে ছড়িয়ে পড়ার পর এর ভয়াবহতা সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য মানুষকে জানতে দেয়নি তারা। বরং তথ্য প্রকাশকারীদের উল্টো হয়রানি করেছিল চীনা কর্তৃপক্ষ। উহানে যখন ভাইরাসটি সম্পর্কে কানাঘুষা চলছিল তখন ‘গুজব রটানো’ ও ‘আনভেরিফাইড তথ্য প্রচারে’র জন্য শাস্তির হুঁশিয়ারি দেয় চীন। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে এমন তথ্য ছড়ানোর দায়ে ৩/৭ বছরের সাজা দেয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়।

তথ্য নিয়ন্ত্রণের মূল্য দিচ্ছে চীন:

চীনা কর্তৃপক্ষ ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক কর্তা ব্যক্তিরা নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় বারবার চীনের অফিসিয়াল বিবৃতির ও কথা বলার ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করে। চীনে মতপ্রকাশের ওপর প্রচলিত সেন্সরশিপের বাইরে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। যার অর্থ হচ্ছে, ভাইরাসটির উদ্ভব এবং সংক্রামণ সম্পর্কে সিপিসির বাইরে অন্য কোনো্ মতামত সেখানে অগ্রাহ্য করা হচ্ছিল। ‘ভয়’ দেখিয়ে আর ‘গুজব’ বলে গোটা ব্যাপারটিকে উড়িয়ে দিয়েছে তারা। নিখাদ স্বাস্থ্যগত সমস্যাটিকেও রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করেছে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি।

কিন্তু দেখা গেল, তথ্য প্রকাশ না করা কিংবা গোপন করার ফলাফল খুব মারাত্মক হয়েছে।
তবে উহানের হুবেই শহরের মেয়র জোও জিয়াংওয়াং ইতিমধ্যে জনগণের সামনে ইস্তফা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি নিজের ব্যার্থতা স্বীকার করে বলেন, তার প্রশাসন যে সতর্কতা জারি করেছিল সেটা ‘পর্যাপ্ত নয়’।

করোনাভাইরাস নিয়ে লুকোচুরি:

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিতে উহানের হুবেই শহরের মেয়র জো জিয়াংওয়াং বলেন, আমরা বুঝতে পারছি আমরা যে তথ্য মানুষকে দিয়েছি সেটা তাদের সন্তুষ্ট করেনি। স্থানীয় সরকার হিসাবে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন ছাড়া তাদের তথ্য সরবরাহের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে জানান মেয়র। তিনি আরো বলেন, ‘এ অবস্থায় আমরা অপরকে দোষ দিতেই পারি কিন্তু আমাদের বুঝা উচিৎ, এটা একটা সংক্রামক রোগ। তাই প্রাসঙ্গিক তথ্য যাতে মানুষ পায় সে ব্যাপারেও খেয়াল রাখতে হয়’।

প্রকৃতপক্ষে উহানের স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরা নিজেদের ব্যর্থ যেমন বলছেন আবার সিপিসির রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সাফাইও গাইছেন।

চীনের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে চীনের অভ্যন্তরে কর্তৃত্ববাদ আরো বিস্তৃতি লাভ করেছে। গণমাধ্যম ও ইন্টারনেট ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ অতীতের তুলনায় আরো বেড়ে গেছে। সরকারের সমালচকদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের তথ্য প্রচারের জন্যও একই কাজ করা হয়েছে। চীনের গণমাধ্যম এখন আরো সংকীর্ণ। আর শি জিনপিং এসব করছেন চীনের ওপর সিপিসির কর্তৃত্ব আরো সুসংসহ করার জন্য। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সর্বশেষ কংগ্রেসে শি জিনপিং নিজেকে মাও সে তুংয়ের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। চীনের মতপ্রকাশের পরিবেশের ওপর সিপিসি এবং শি জিনপিং ‘ওয়াচডগে’র ভূমিকা নিয়েছেন। মূলত সিপিসির লাভ কিসে- এর বাইরে কোনো কিছুই গ্রহণ করে না চীনের ইন্টারনেট ও গণমাধ্যম। তবে এখন বোঝা গেলো, কোনো ইস্যুর একটিমাত্র রাষ্ট্রীয় বিবৃতি কতটা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

তবে এরইমধ্যে চীনের সর্বোচ্চ আদালত তথাকথিত ‘গুজব রটনা’য় অভিযুক্তদের হয়রানি করার দায়ে পুলিশকে অভিযুক্ত করেছে। চীনের যেসব স্বাস্থ্যকর্মী করোনাভাইরাস নিয়ে সতর্কতা বার্তা দিয়েছিল তাদের হয়রানি করার ব্যাপারেও কথা বলেছে আদালত।

পরিস্থিতি এত নাজুক হত না:

চীনের সুপ্রিম কোর্ট বলছে, ‘যদি জনগণ ভাইরাস সংক্রামণের তথ্য সময়মতো শুনতে পারতো তাহলে তারা শুরু থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারতো। মাস্ক পরা, বন্য প্রাণীদের মাংস খাওয়া, প্রাণীদের সংস্পর্শে যাওয়া এবং সংক্রামণ ঘটার পদ্ধতি ইত্যাদি ব্যাপারগুলোতে সতর্ক থাকতে পারলে পরিস্থিতি এরকম হত না’।

যে সমস্ত খাবার খেলে ভাইরাসটি ছড়াতে পারে সেরকম খাবার থেকেও দূরে থাকা সম্ভব হয়নি। এছাড়া তারা পুরো ব্যাপারকে মিথ্যে প্রচার বলে চালিয়েছে। এ ধরনের ভাইরাস যদি গোড়ার দিকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে সেটা দ্রুত ছড়াবে, কারণ এসব ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। তাই শুরুতে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পরিস্থিতি খারাপ হবেই। অন্যদিকে করোনাভাইরাস ছড়ানোর ব্যাপারকে সিরিয়াসলি নিয়ে এর বিরুদ্ধে নির্দেশনা জারি করতে পারলে অবস্থা এত নাজুক হতো না। এখানেও পিছিয়ে ছিল চীন। ফলশ্রুতিতে চীনের রাষ্ট্রীয় বক্তব্য কর্তৃক ভিন্নমতকে সহ্য করতে না পারার খেসারত দিচ্ছে এখন। প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জনগণকে আড়াল করার চেষ্টা মারাত্নক বিপদ ডেকে এনেছে।

বরং এখন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি যখন দেখছে যে অবস্থা আসলেই বেগতিক তখন আর মুখ লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। এখন আবার উল্টো হাওয়া বইছে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে চীনের পদক্ষেপগুলো জনগণের সামনে উপস্থাপন করে সেগুলোকে সিপিসির কৃতিত্ব হিসাবে দেখানো হচ্ছে এবং সামনেও সেরকমই হবে। আবার সুপ্রিমকোর্টের মন্তব্য নিয়ে কমিউনিস্ট পার্ট জুতসই কোন জবাব দেয়নি বরং চীনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উইচ্যটে গুজবের বিরুদ্ধে আরো কড়া পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়া হয়।

(সিএনএনে প্রকাশিত জেমস গ্রিফিথসের প্রতিবেদন অবলম্বনে)

সূত্র ও অনুবাদ: মুশফিকুর মুজাহিদ অনিক (ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন)

Comments

comments