সেই সোসাইটি গার্লের সাথে রাষ্ট্রপতির ছবি, নিন্দার ঝড়

সম্প্রতি অবৈধ ব্যবসার দায়ে শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ নামে এক যুব মহিলা লীগ নেত্রীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। গতকাল সকালে তার স্বামী মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন, সাবিক্ষর খন্দকার (২৯), শেখ তায়্যিবা (২২)সহ আরও দুজন বিদেশে যাওয়ার প্রাক্কালে বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। শুরুতে পাপিয়া প্রথমে নিজের দাপুটে অবস্থানের পরিচয় দেন। তবে কোনো কিছুতে গুরুত্ব না দিয়ে পাপিয়ার কাছ থেকে র‌্যাব কর্মকর্তারা উদ্ধার করতে থাকেন অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

জানা গেছে, আলোচিত এই নারী হচ্ছেন নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাাদক। ক্ষমতাসীন ছত্রছায়ায় সব পাঁচ তারকা হোটেল গুলোতে এসকর্ট ব্যবসা চালাতো এই সোসাইটি গার্ল। আওয়ামী লীগ দলীয় নেতাদের সাথেও রয়েছে তার অন্তরঙ্গ ছবি। এমনকি রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সাথেও রয়েছে এই সর্দারিনীর ছবি।

এদিকে এসব ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশের পর নিন্দার ঝড় উঠেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের নৈতিকতা নিয়ে। আবার কেউ কেউ বলছেন পতিতা ও মাদক ব্যবসার দায়ে বহুগামী পাপিয়াকে যদি দল থেকে বহিষ্কার করা হয় তাহলে সে যাদের মাধ্যমে সে এই পথ বেছে নিয়েছে তাদেরকেও দল থেকে বহিষ্কার করা প্রয়োজন।

জানা যায়, গত ১২ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ৫৯ দিন প্রেসিডেনশিয়াল স্যুট ভাড়া ছিল পাপিয়ার নামে। ওই ৫৯ দিনে তিনি ৮১ লাখ ৪২ হাজার টাকা নগদ (ক্যাশ) পরিশোধ করেছেন। পাপিয়ার স্বামী সুমন চৌধুরী বেশির ভাগ সময় থাইল্যান্ডে অবস্থান করলেও গত থার্টিফার্স্ট নাইটে রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে অবস্থান করেন। ওই রাতে তার কক্ষেও চার-পাঁচ জন সুন্দরী নারী ছিল বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে। পাপিয়ার সব কর্মকান্ডের অন্যতম অংশীদার তার স্বামী সুমন।

একসময় নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ছিলেন সুমন। পরে ছিলেন নরসিংদীর প্রয়াত পৌর মেয়র লোকমানের বডিগার্ড। র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল শাফি উল্লাহ বুলবুল জানান, তার বার্ষিক আয় ১৯ লাখ টাকা হলেও পাপিয়া গত তিন মাসে শুধু একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করেছেন! এ ছাড়া তার নামে একটি হোটেলের প্রেসিডেন্ট স্যুট সব সময় বুকড থাকত। ওই হোটেলেই তার নিয়ন্ত্রণে ছিল সাতটি মেয়ে। গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে সাতটি পাসপোর্ট, নগদ ২ লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ জাল টাকা, ১১ হাজার ৯১ ইউএস ডলার, বিভিন্ন দেশের মুদ্রাসহ বিপুল পরিমাণ জাল মুদ্রা জব্দ করা হয়। র‌্যাবসূত্র ও আমাদের নরসিংদী প্রতিনিধির পাঠানো তথ্যানুযায়ী, নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমন। প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের দ্বারা রাজনীতিতে হাতেখড়ি।

২০০১ সালে পৌরসভার কমিশনার মানিক মিয়াকে যাত্রা প্যান্ডেলে গিয়ে হত্যার অভিয়োগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ওই হত্যাকান্ডের এজাহারভুক্ত আসামি সুমন ওরফে মতি সুমন। হত্যাকান্ড ও সন্ত্রাস কর্মকান্ডের ওপর ভর করে তার উত্থান। বছর দশেক আগে প্রেমের সম্পর্কের পর পাপিয়া চৌধুরীকে বিয়ে করেন সুমন। লোকমান হত্যাকান্ডের পর বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামানের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। মেয়রের ক্যাডার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বছর তিনেক পর পাপিয়া চৌধুরীর ওপর সন্ত্রাসী হামলা হয়। ওই সময় পাপিয়াকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। এরপর তারা নরসিংদী ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমান। ঢাকায় এমপি সাবিনা আক্তার তুহিনের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। এর পর থেকে পাপিয়া চৌধুরী ও তার স্বামী সুমন ওরফে মতি সুমন রাজধানীর সাবেক এক সংরক্ষিত এমপির আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। ওই এমপির সঙ্গে তার গাড়ির ব্যবসা আছে বলে জানা গেছে। নরসিংদীর শালিদা এলাকায় আরএসএম কার ওয়াশ নামে একটি গাড়ির সার্ভিস সেন্টার রয়েছে। নরসিংদীতে রয়েছে সুমন ও তার স্ত্রী পাপিয়ার বিশাল কর্মীবাহিনী। নরসিংদী কলেজ শাখা ছাত্রলীগ ও জেলা ছাত্রলীগের অনেক নেতা-কর্মী যারা তার অনুসারী তারা ‘কিউ অ্যান্ড সি’ ট্যাটু ব্যবহার করেন। মাঝেমধ্যেই তারা বিশাল শোডাউন দেন আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিংয়ে। মাস্টারমাইন্ড সুমনের সন্ত্রাসের পাশাপাশি অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও সম্পৃক্ততা রয়েছে।

Comments

comments