আমি কি চোর, সাংবাদিকদের ওপর রেগে মাশরাফি

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পর দিন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ। শনিবার দুপুরে তাই রুটিন সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। কিন্তু টাইগার অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলনে পর দিনের ম্যাচটাই যেন উধাও। নড়াইল এক্সপ্রেসকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বারবার প্রশ্ন শুনতে হলো নিজের অবসর ভাবনা প্রসঙ্গে। কখনো বা আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পারফরম্যান্স নিয়ে।

যে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে বরাবরের ঠান্ডা মাথার মাশরাফী নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন খুব কম সময়ই। কাটাকাটা উত্তরই দিয়ে গেলেন তিনি।

বিশ্বকাপের আগে থেকেই অবসর নিয়ে প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে। বিশ্বকাপের পর তো মাশরাফীর অবসরই কখনো বা কখনো টক অব দ্য ক্রিকেট হয়েছে। মাশরাফীকে এসব বিব্রত করে কিনা জানতে চাইলে মাশরাফী ছোট্ট উত্তর দিলেন, ‘কোনো বিব্রত করে না।’ গেলেন পরের প্রশ্নে। কিন্তু পরিস্থিতি যেন ধীরে ধীরে অশান্ত হলো। ঝড় বইয়ে গেল মাশরাফীর হৃদয়ে।

বিশ্বকাপের আগে মাশরাফী ঘোষণার সুরেই বলেছেন, শেষ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন। কিন্তু এরপর মাশরাফীর অবসর নিয়ে যত কথাই হোক, নিজে থেকে এ বিষয়ে কিছু পরিষ্কার করেন ৩৬ বছর বয়সী। বোর্ড আবার মাশরাফীকে বিদায় জানাতে তৈরি, এমন বিষয়টিও সামনে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই সংবাদমাধ্যমের মাশরাফীর মনের ভাবনাটা জানতে ব্যাপক আগ্রহ।

বারবার তাই একই প্রশ্ন চলে আসে। অবসর প্রসঙ্গে তাই মাশরাফীকে আবার শুনতে হয়, ‘…সবকিছু কিছু মিলিয়ে কিছু ঠিক করেছেন কিনা, নির্দিষ্ট কোন জায়গায় থাকবেন?’

এবার মাশরাফীর ঝাঁজালো উত্তর, ‘যদি থামতে হয় তো আপনারা জানবেন। থামাথামির বিষয়ে তো অনেকবার প্রশ্ন করেছেন। বারবার প্রশ্ন করার তো কিছু নেই। আর আমার জায়গায় আপনারা কী কোনো কিছু আন ক্লিয়ার আছেন? ’

মাশরাফী এখানেই থামেন না, ‘একই প্রশ্ন তো বারবার করার কিছু নেই। বোর্ড থেকে যদি কিছু বলে, আপনাদের কিছু যদি জানার থাকে বোর্ডে, সেটা আপনারা বোর্ডকে জানাবেন। বোর্ড বোর্ডের সিদ্ধান্ত জানাবে। আমার সাথে যেটা আলোচনা হবে সেটা পাপন ভাই (বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন) বা বোর্ড সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তাদের সঙ্গে। কিন্তু সেটা আপনাদের কাছে বলার কিছু নাই।’

‘আপনার নিজের চাওয়াটা কী?’ আরো একটা প্রশ্ন মাশরাফীর সামনে। এবার টাইগার অধিনায়কের উত্তর, ‘একই প্রশ্ন করছেন আপনি। আমার চাওয়া তো আপনাকে বলব না। আমার চাওয়া আমি বোর্ডকে জানাব। ক্রিকেট বোর্ড যদি আপনাদের চায় জানিয়ে দেবে। আমার যদি জানানোর থাকে, সে রকম পরিস্থিতি এলে জানিয়ে দেব।’

প্রশ্ন হয়েছে মাশারাফীর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পারফরম্যান্স নিয়েও। বিশ্বকাপ মোটেও ভালো যায়নি তার। চারদিকে সমালোচনা। এসব আত্মসম্মানে আঘাত করে কিনা? মাশরাফীকে আত্মসম্মান শব্দেই সবচেয়ে বেশি আগুনে শোনালে।

‘প্রথমত হচ্ছে আত্মসম্মান বা লজ্জা…। আমি কী চুরি করি মাঠে? আমি কী চোর? খেলার সাথে লজ্জা, আত্মসম্মান আমি মেলাতে পারি না। এত জায়গায় এত চুরি হচ্ছে, চামারি হচ্ছে তাদের লজ্জা নাই। আমি মাঠে এসে উইকেট না পেলে আমার লজ্জা লাগবে। আমি কী চোর? উইকেট আমি নাও পেতে পারি। আমার সমালোচনা আপনারা করবেন, সাপোর্টাররা করবে।’

‘আমি কী বাংলাদেশের হয়ে খেলছি, না অন্য কোনো দেশের হয়ে খেলছি যে আমাকে লজ্জা পেতে হবে? আমি পারিনি, আমাকে বাদ দিয়ে দেবে। বিষয়টা তো সিম্পল। কথা হচ্ছে আমি লজ্জা, আত্মসম্মানবোধ কার সঙ্গে দেখাতে যাব। আমি তো বাংলাদেশের হয়ে খেলতে নামছি। আমি কী বাংলাদেশের মানুষের বিপক্ষের মানুষ? যে কেউ পারফর্ম নাই করতে পারে। সেটা তো তার ডেডিকেশন, যদি তার কোনো ঘটতি থাকে, যদি সে ডিসিপ্লিন না থাকে, সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন আসতেই পারে।

‘আরেকটা জিনিস সমালোচনা হতে পারে, যেটা সারা বিশ্বেই হচ্ছে। যে আমি উইকেট পাইনি আমার সমালোচনা হবে। কিন্তু কথাটা যখন আসে লজ্জার, আত্মসম্মান বোধ, তখন আমার প্রশ্ন আসে। ক্রিকেট খেলতে এসে আমি কী আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিতে আসছি?’

‘সবকিছু মিলে হয়তো আমি পারফর্ম করিনি। জিনিসটা একটু জটিল জায়গায় আছে। কিন্তু এটা নিয়ে ভেবে তো আমি এখান থেকে বের হতে পারব না। আমি গ্যারান্টি দিয়েও বলতে পারব না আমি ৫ উইকেট নিয়ে সব শেষ করে দিলাম। একটা খেলোয়াড়ের জন্য একটা বয়স বা একটা সময় হয়তো আসে, যখন প্রতিদিনই তার জন্য চ্যালেঞ্জিং। আমি হয়তো সেই সময়টায় আছি। কিছুদিন পর হয়তো মুশফিক, রিয়াদ যারা আছে তাদেরও এই সময়টা আসবে। ইয়াং যারা থাকবে তাদের সঙ্গে মেলাতে চাইবে। এটা একটা প্রক্রিয়া।’

Comments

comments