আধা বোতল মদ-গাঁজা, কুড়িগ্রামের ডিসি ও নিরস্ত্র সাংবাদিক

আরিফুজ্জামান তুহিন

বাংলা ট্রিবিউনের রিপোর্টার আরিফুল ইসলামের খবরটি শোনার পর কেমন যেন অদ্ভুত ‘ম্লান বেতফলের’ মতো আমার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আমার তখন বারবার নিজের কথা মনে হয়। এই সব ‘সুলতানার’ দেশে আমি কৃষকের সন্তান, কেরানির সন্তান এই দেশে মধ্যরাতে আমার বাসার দরজা ভেঙে ধরে নিয়ে যাবে রাজার পরিষদ বর্গ। আর পরদিন জানা যাবে মাদক ব্যবসার কারণে আমার এক বছর কারাদণ্ড হয়েছে।

কুড়িগ্রাম শহরে সরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ের অনুদানে পুকুর সংস্কার করেন জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন। পুকুরটির নাম নিজের নাম অনুসারে ‘সুলতানা সরোবর’ রাখেন। বাংলা ট্রিবিউনের রিপোর্টার আরিফুল ইসলামের ‘কাবিখা’র টাকায় পুকুর সংস্কার করে ডিসি’র নামে নামকরণ!’ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে গত বছরের ১৯ মে। এ ঘটনার এতদিন পরে কেন আরিফুলকে মধ্যরাতে ম্যাজিস্ট্রেট কথিত ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে দণ্ড দেবে!! এর কারণ হতে পারে সম্প্রতি আরিফুল ইসলাম জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে রিপোর্ট করতে চেয়েছিলেন। সম্ভবত রিপোর্ট করার আগে ডিসির সঙ্গে কথা বলার কারণে নিজের থলের কালো বিড়ালগুলো যাতে বেরিয়ে না আসে সে কারণে মধ্যরাতে আরিফুল ইসলামকে দণ্ড দিতে হয়েছে।

একটি রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের প্রশাসন কতটা দেউলিয়া হলে একজন নিরস্ত্র সাংবাদিককে হেনস্তা করতে মধ্যরাতে কথিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১ বছরের কারাদণ্ড দিতে হবে। আমার এক সহকর্মী বললেন, মাত্র এক বছর। এই উল্টো রাজার দেশে ডিসি মহারাজার বিরুদ্ধে রিপোর্ট করার অপরাধ হিসেবে অন্তত ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া উচিত ছিল। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজার মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়ে ভূতাপেক্ষ এই দণ্ড কার্যকর করার বুদ্ধি সে বের করে দিয়েছে।

তবে আমাদের মত কৃষক ও কেরানির সন্তানরা আপনার মত রাজা ধীরাজের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করায় আরিফুলের বিরুদ্ধে আরও কঠিন কোনো অভিযোগ আনতে পারতেন। এই যেমন ধরেন, আরিফ নব্য জেএমবির নেতা। তার বাসা থেকে জিহাদের বড় বড় বই পাওয়া গেছে। নিদেন পক্ষে জামাত শিবিরের গোপন বৈঠক হচ্ছে এটাও অভিযোগ আনা যেতো। তাহলে হয়তো চেতনাবাজরা আরিফের ফাঁসি চেয়ে একটা গণ আদালত বসানোর দাবি তুলতে পারত।

এটি দেশ? এটি আদালত? এটি একটা বড় জঙ্গলের নাম, যেখানে বিচারের নামে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে কিছু শ্বাপদ সংকুল কিলবিল করছে। করোনা ভাইরাস থেকে এরা বেশি বিপজ্জনক।

এই ঘটনায় কুড়িগ্রামের সাংবাদিকেরা কি করতে পারেন তার ছোট একটা পরামর্শ দিই। প্রথম কাজ হলো ডিসি সাহেবের একটা ফান্ড বা তহবিল থাকে নাম এলআর ফান্ড। এটি একটি সরকারি ব্যাংকে থাকে। সাধারণত সোনালী ব্যাংকে। কুড়িগ্রাম সদর সোনালী ব্যাংকের লোকদের ধরে এই অ্যাকাউন্টে (অ্যাকাউন্ট নম্বরটি প্রকাশ্য পাওয়া যায়) এই ডিসি সুলতানা জয়েন করার পর কত টাকা জমা পড়েছে আর কত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে তার একটি হিসাব বের করেন। সেই তথ্যটুকু প্রকাশ করে দেন, তাহলে জানা যাবে গোপন ঘুষের বাইরে প্রকাশ্য কত টাকা এই তহবিলে তিনি নিয়েছেন।

এলআর ফান্ড হলো ডিসি সাহেবদের একটি অ্যাকাউন্ট যেখানে যে কেউ টাকা জমা দিতে পারে আর ডিসি সাহেব ইচ্ছেমতো তুলে নিতে পারেন। এই তহবিলের অর্থের কোনো হিসাব ডিসিকে দিতে হয় না। মানে এটি একটা সরকার প্রদত্ত ঘুষ খাওয়ার ভালো উপায়।

এদিকে আরেক সাংবাদিক কাজল ভাই কয়েকদিন হলো তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার অপরাধ, কাজল ভাই যুবলীগ নেত্রী পাপিয়া সংক্রান্ত নিউজ শেয়ার দিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে এ কারণে সরকারের একজন সাংসদ তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে। কাজল ভাইর কথা কি বলব? আমাদের কারওরই কোনো নিরাপত্তা নেই।

নিজের কথা বলি। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি একবার ডেকে অনেক কথা বললেন। সবশেষে বললেন, আপনিতো মোটরসাইকেল চালান। রাতে একা একা বাড়ি ফেরেন, ভয় করে না? জানি না- হঠাৎ কই থেকে পাভেল করাচিগানের কথা মনে পড়ল। আমি খুব সাহস করে বললাম, জীবনে জন্মেছি একবার, মরবও একবার। প্রতিদিন মরার কি আছে?’ এর পরক্ষণেই খুব ভয় পেলাম। ভয় আমাকে গ্রাস করল।

এখন আমি তেমন একটা বাইক চালাই না। খুব মাঝে মধ্যে। আমি উবার, সিএনজি, রিকশা নানান পদ্ধতিতে কাজ সারি। রাত হলে সব সময় পেছনে তাকাই। কারণে অকারণে ভয় পাই। মনে পড়ে এ রকম ভয় আমাকে সর্বদা গ্রাস করত নাস্তিক তালিকায় নাম আসায়। আমি কখনো এক রাস্তা ব্যবহার করিনি সে সময়।

কোনো একদিন বিপ্লবের ভূত মাথায় চাপায় আমরা ঢাকা শহরের সব চিপা চাপা ঘুপচি গলি চিনতাম। ভাবতাম, কোনো একদিন পুলিশ আমাদের পেছন নেবে বা ষাটের দশকের নকশাল নেতা সরোজ দত্তের মত এনকাউন্টার/ক্রসফায়ারে গুলি করে মারবে এবার আর তা হবে না। আমরা এই সব লাখো গলিতেই তুমুল যুদ্ধ-প্রতিরোধ দাঁড় করাব। তারপর মানুষের ইচ্ছেগুলো মরে যায় নদীর মত, হয়তো বা নিজেও একদিন মরে যায়। লাশের গন্ধ আটকাতে দামি পারফিউম মাখে। তারপর একদিন মধ্যরাতে আদালত বাড়ি এসে দণ্ড দিয়ে যায়। হে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ও সাহেবান কি দণ্ড দেবেন আমাদের? আমরাতো ‘দণ্ডিত অপুরুষ’।

এই রাষ্ট্র আপনাদের, এই রাষ্ট্র ডিসি, ম্যাজিস্ট্রেটের। আমরা কৃষক কিংবা কেরানির সন্তান। আমাদের রাষ্ট্র নেই। আপনাদের রাষ্ট্রে, আপনাদের সমালোচনা করা পাপ। বড় পাপ হে। আপনি বরং পা ফাটা কৃষকের ঘামে গড়া রাষ্ট্রে, শ্রমিকের লাশের ওপর দাঁড়ানো রাষ্ট্রে ‘সুলতানা সরোবর’ গোসল করুন। পাশে রাখতে পারেন ১০৮টি নীলপদ্ম।

বাংলা সিনেমায় যেমন নায়িকার গানের দৃশ্যে সখীরাও নৃত্য করে, কোমরে খালি কলস রাখে-আপনি চাইলে এই আয়োজন করাও সম্ভব। আমরা না হয় তখন চৌধুরীদের বাড়ি, আপনার ডিসি বাংলার সামনে ভিখারীদের মত দাঁড়িয়ে থাকব।

‘একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো,

লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা।

ভিখারির মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি, ভেতরে রাস-উৎসব।

অবিরল রঙের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণীরা,

কত রকম আমোদে হেসেছে আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি!

বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন, আমরাও

বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই

সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস-উৎসব

আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না!’

লেখক: সাংবাদিক

Comments

comments