করোনা কি বদলে দিচ্ছে রাজনীতি?

করোনা নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের পরস্পরের দোষারোপের মধ্যেই বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার৷ সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে দুই বছরেরও বেশি সময় কারাগারে থাকার পর তিনি বুধবার মুক্তি পেতে পারেন৷

খালেদা জিয়ার এই মুক্তি তার সাজা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে দুই শর্তে৷ আর শর্ত দু’টি হলো: খালেদা জিয়াকে বাসায় থেকে বাংলাদেশের হাসপাতালেই চিকিৎসা নিতে হবে৷ এবং তিনি মুক্তির সময়ে দেশের বাইরে যেতে পারবেন না৷ তবে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার এই সিদ্ধান্তের মধ্যে করোনা পরিস্থিতিকে বিবেচনা করছেন অনেকেই৷

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে প্রথম মৃত্যুর খবর দেয়া হয় ৮ মার্চ৷ এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যু হয়েছে করোনায়৷ আক্রান্তের সংখ্যা ৩৯ জন৷ এরইমধ্যে পুরো দেশ অবরুদ্ধ হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে৷ ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি এলাকা লকডাউন করা হয়েছে৷ ২৭ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে৷ গণপরিবহনও একই দিন থেকে বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে৷ শিল্প ও পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে৷ মঙ্গলবার থেকে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী৷ তারা জনসমাগম বা জটলা করতে দেবেনা৷ সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সবাইকে ঘরে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে৷ যদিও ঢাকা থেকে গ্রামে ছুটছেন মানুষ, যা করোনা পরিস্থিতিকে আরে জটিল করতে পারে৷

এই পরিস্থিতির মধ্যে খালেদা জিয়াকে মুক্তির সিদ্ধান্ত দেশের মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে৷ করোনার কারণে রাজনীতি বদলে যাওয়া কিনা জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, সবসময় পরিস্থিতিতো আর এক থাকে না৷ এখন পুরো বিশ্বই দুর্যোগের মুখে৷ তাই আগের রাজনৈতিক চিত্রতো বদলাবেই৷ এখন মানুষের জীবনই বড় কথা৷ রাজনীতির কথা পরেও ভাবা যাবে৷’

খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্তের খবরের পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নেতা-কর্মীদের শান্ত থাকতে বলেছেন৷ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গুলশানে চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ের সামনে তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই আহ্বান জানান৷ তিনি বলেন, ‘‘এখন করোনা ভাইরাস আক্রমণের এই সময়ে দলের নেতাকর্মীরা শান্ত থাকবেন৷ কেউ যেন আক্রান্ত না হন খেয়াল রাখবেন, শান্ত থাকবেন৷ এই মুহূর্তে স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হবেন৷”

আর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘করোনা দেশে দেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে দিচ্ছে৷ এই দুর্যোগে রাজনীতির অনেক কিছু বদলে যাচ্ছে৷ আমি মনে করি সেই প্রেক্ষাপটেই সরকার খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ আমার মনে করি সরকার মানবিক এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ তারা এই সিদ্ধান্ত যদি বহাল রাখে তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবশ্যই গুণগত এবং মানবিক পরিবর্তন আসবে৷”

আর রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক শান্তনূ মজুমদার বলেন, ‘‘সময় এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার খালেদা জিয়াকে সঠিক সময়ে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ আমরা মনে হয় এরমধ্যে রাজনৈতিক বিবেচনা যেমন আছে তেমনি মানবিক দিকও আছে৷ করোনার কারণে বিশ্ব এবং দেশের যা পরিস্থিতি তাতে খালেদা জিয়াকে এখন বাসায় রাখাই সঠিক৷”

এদিকে খালেদার মুক্তির পরই মুক্তির দাবি উঠেছে কথিত যুদ্ধাপরাধের ভিত্তিহীন অভিযোগে কারাবন্দী মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও টুইটারে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ সাঈদীর মুক্তির দাবি জানিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন।কেউ কেউ ভিডিও বার্তার মাধ্যমেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করেছেন।

আর প্রাণঘাতী করোনার কারণে যদি খালেদা জিয়া মুক্তি পেতে পারেন তাহলে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কেন মুক্তি পাবেন না এমন প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে।

তাদের যুক্তি হলো, খালেদা জিয়াকে যেমন ভিত্তিহীন দুর্নীতির মামলায় সাজা দিয়েছে, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকেও ঠিক তেমনি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে সাজা দেয়া হয়েছে। তারও মুক্তি পাওয়ার অধিকার আছে।

বর্তমান এই মহামারিতে কারাগারগুলো সবচেয়ে অনিরাপদ জায়গা। বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার বন্দিকে তারা মুক্তি দিচ্ছে। আর বাংলাদেশের কারাগারগুলোর অবস্থাতো আরও বেশি খারাপ। যেকোনো সময় একজন মানুষ করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন।

আর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী শুধু জামায়াত নেতা নন, তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও পরিচিত একজন ব্যক্তি। বর্তমান বিশ্বে যে কয়জন ইসলামী চিন্তাবিদ আছেন তাদের মধ্যে মাওলানা সাঈদী একজন। তিনি বাংলাদেশের যেকোনো নেতা নেত্রীর চেয়ে মানুষের কাছে বেশি জনপ্রিয়। তাই খালেদা জিয়ার মতো মাওলানা সাঈদীর সাজাও স্থগিত করে মুক্তি দেয়া উচিত বলে মনে করছেন অনেকে।

Comments

comments