ইতালি প্রবাসীর ঘরে ফেরা ও দেশে লকডাউন শুরুর গল্প

৭ মার্চ ২০২০। তখনও বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলেনি। ওই দিন বাংলাদেশে আসেন শিবচর পৌর এলাকার এক ইতালি প্রবাসী। বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের কোনো সংবাদ পাওয়া না গেলেও ইতালিতে ওই সময় মহামারি চলছিল। বাংলাদেশে পৌঁছার পর থেকেই ওই ইতালি প্রবাসী জ্বর, কাশি ও গলা ব্যথা অনুভব করেন। চিকিৎসা নিতে প্রথমেই শরণাপন্ন হন স্থানীয় সরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসকের। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ওই চিকিৎসক তাকে ঢাকায় চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা তার ইতিহাস ও উপসর্গ বিশ্লেষণ করে তাকে কোভিড-১৯ আক্রান্ত বলে সন্দেহ করেন। পরে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) পরীক্ষা করা হলে তার কোভিড-১৯ পজিটিভ হয়। এরপর আইইডিসিআরের প্রতিনিধি দল মাঠে নেমে ওই করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসা মানুষের তালিকা প্রস্তুত করে ব্যবস্থা নেয়। আইইডিসিআরের পরীক্ষায় একে একে কোভিড-১৯ পজিটিভ হয় তার স্ত্রী, ছয় বছর ও দুই বছর বয়সী দুই শিশু সন্তান, বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালকের স্ত্রী, চিকিৎসক ও এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

আইইডিসিআরের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের হোম কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়। হোম কোয়ারান্টাইনে নেয়া হয় তার ছয় বছরের মেয়ের স্কুলের ১৯ সহপাঠীকেও। ওই ইতালি প্রবাসীর মেয়ে গত ১১ মার্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাসে যায়। ওই ক্লাসে সেদিন ১৯ শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল। আইইডিসিআর যেদিন ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে জেলাওয়ারি করোনা রোগীর তালিকা প্রকাশ করেন সেদিন ঢাকা জেলার পরই ছিল মাদারীপুরের অবস্থান। এর মধ্যে জেলার তালিকায় শিবচর উপজেলায় ছিল ৯ জন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক সংবাদ সম্মেলনে মাদারীপুর, ফরিদপুর ও শিবচর প্রয়োজনে লকডাউন করার কথা বলেন।

গত ১২ মার্চ (বৃহস্পতিবার) সন্ধায় সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে চিহ্নিত এলাকাগুলোতে জনসমাগম এড়াতে শিবচর উপজেলা প্রশাসন কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রথম অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকানপাট খোলা রেখে সব ধরনের দোকানপাট এবং গণপরিবহন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তার কিছুক্ষণ পরই প্রশাসন আবার সেই সিদ্ধান্ত কিছুটা শিথিল করে। তবে থেমে থাকেনি দেশের প্রচার মাধ্যম। উপজেলা প্রশাসনের ওই সিদ্ধান্তের পরপরই গণমাধ্যমও প্রচারিত হয় শিবচর লকডাউন হওয়ার খবর।

পরদিন ১৩ মার্চ (শুক্রবার) মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলামের সভাপত্বিত্বে শিবচরে আবার জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মাদারীপুরের পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন, আইইডিসিআররের প্রতিনিধি দল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নূর-ই-আলম মিনার নেতৃত্বে জেলা পুলিশও সভা করে। সেখান থেকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত পৌর এলাকার ২ এবং ৩ নম্বর ওয়ার্ড, দক্ষিণ বহেরাতলা ইউনিয়নের একটি গ্রাম ও পাঁচ্চর ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামের কিছু এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরের দিন থেকে চিহ্নিত এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করে জনবিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। জনসমাগম এড়িয়ে চলতে কঠোর নির্দেশ দেয় জেলা প্রশাসন।

কিন্তু খাবার সংকটের কথা চিন্তা করে মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর নিদের্শে ওইসব এলাকার মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার পৌছে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। পরদিন থেকে উপজেলার ১৯ ইউনিয়ন ও শিবচর পৌর এলাকার সর্বত্র হোম কোয়ারাইন্টনে থাকা প্রবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে খাবার পৌঁছানো শুরু হয়। এ পর্যন্ত প্রবাসী ও স্বল্প আয়ের ৮০০ পরিবারের মধ্যে ৮২ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ডাল, পিঁয়াজ, তেল, আলু, ওষুধসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য বিতরণ করা হয়। ৫৭৫ জন মৎস্যজীবী পরিবারকে ৮০ কেজি করে চাল এবং দরিদ্র অসহায় ২ হাজার ১৯৬ পরিবারের মধ্যে ভিজিডির ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হয়। উপজেলার নিম্ন আয়ের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে এই সাহায্যের আওতায় নেয়া হয়েছে।

এটাই দেশের মধ্যে প্রথম লকডাউন করা এলাকা। বিদেশ থেকে আসা ওই রোগীর সংস্পর্শে আসেন তার পরিবার ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। প্রয়োজন অনুসারে তাদের কাউকে আইসোলেশনে এবং আক্রান্তদের সরকার নির্ধারিত চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে গত বুধবার (২৫ মার্চ) ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার বাবা মারা যান।

এদিকে করোনা আতঙ্কে গোটা শিবচরে সুনসান নিরবতা ও নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে শিবচরের চিহ্নিত এলাকার ৭০ হাজার মানুষ হোম কোয়ারান্টাইনে রয়েছে। শুধু তারাই নয়, এলাকার ৭ লাখ মানুষই স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। বাজার হাট-ঘাট সবই বন্ধ। স্থানীয় প্রতিটি ইউনিয়ন, গ্রাম, পাড়া, মহল্লার দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। ভ্যান ও অটোচালকরা ঘরে বসে আছেন। সকালের দিকে কাঁচাবাজার খোলা রাখা হচ্ছে। তবে সংক্রমণ এড়াতে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাশাংক চন্দ্র ঘোষ বলেন, এই উপজেলায় একজন প্রবাসীর পরিবারের ৮ জনসহ নয়জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে আক্রান্ত প্রবাসীর বাবা মারা গেছেন বলে শুনেছি। আইইডিসিআর গত দুইদিনে ১৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করলেও সবাই করোনা নেগেটিভ বলে জানাতে পেরেছি। উপজেলাটি এখন উন্নতির দিকে বলে তিনি দাবি করেন।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মিডিয়াকর্মীসহ সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় করোনা ঝুঁকি এড়াতে একযোগে কাজ করছি। মুলত উপজেলাটি সঠিক সময়ে লকডাউন ঘোষণা করার পর চিফ হুইপ স্যারের ওষুধ ও খাবার বিতরণ কর্মসূচি চালু হওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষ ও প্রবাসীরা আশস্ত হয়। তাই মানুষ বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। মানুষ এখন অনেক সচেতন।

মাদারীপুরের সিভিল সাজন ডা. মো. শফিকুল ইসলাম জানান, জনৈক ইতালি প্রবাসী করোনা রোগের উপসর্গ নিয়ে প্রথমে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার দেখান। পরে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন। সেখান থেকে আইইডিসিআরের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনিই প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন।

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, শিবচরের অনেক মানুষই ইটালিসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাস করেন। করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি গত ৭ মার্চ প্রথম এদেশে প্রবেশ করেন। প্রথমে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নেন। আইইডিসিআরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন। তিনিই সম্ভবত বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী বলেন, হোম কোয়ারেন্টাইন (ঘরবন্দি) এলাকার মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার পৌঁছে দিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি। উপজেলার ১৯ ইউনিয়ন ও শিবচর পৌর এলাকার সর্বত্র হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা প্রবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের কাছে খাবার পৌঁছে দিব। মানুষ কষ্ট করে ঘরে থাকলেও অন্তত তাদের না খেয়ে থাকতে হবে না।

লেখক:এ কে এম নাসিরুল হক (জাগো নিউজ)

Comments

comments