কারাগার থেকে বের হয়েই রাতের আঁধারে পালালেন ভারতীয় নাগরিক

আদালতে বিচারাধীন দুই মামলায় জামিনের পর রাতের আঁধারে সীমান্ত পথে ভারতে পালিয়েছেন প্রণব মণ্ডল।

চারঘাট সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে গুলি বিনিময়ের সময় বাংলাদেশের জলসীমায় অনুপ্রবেশকারী ও পরে গ্রেফতার হওয়া ওই ভারতীয় নাগরিক গত ২৩ মার্চ রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ছাড়া পান।

জানা যায়, জামিনের শর্তানুযায়ী জামিনদার অথবা আত্মীয় বাড়িতে অবস্থানের বদলে পরদিন ২৪ মার্চ রাতের আঁধারে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গেছেন প্রণব মণ্ডল।

গত ২৫ মার্চ ভোরে ভারতের কাকমারী বিএসএফ ফাঁড়ির জওয়ানরা তাকে গাড়িতে করে নিজ গ্রাম পশ্চিমবঙ্গের জলঙ্গি থানার শিরচর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেন। এ ঘটনায় রাজশাহীর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে তোলপাড় চলছে। প্রণব মণ্ডলের বাবার নাম বসন্ত মণ্ডল।

এদিকে আলোচিত ভারতীয় নাগরিক প্রণব মণ্ডলের জামিন ও ছাড়া পাওয়ার পর সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সম্পর্কে কিছুই জানে না রাজশাহীর ১ বিজিবি ব্যাটালিয়ান কর্তৃপক্ষ।

রাজশাহীর বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল ফেরদৌস জিয়াউদ্দিন মাহমুদ যুগান্তরকে জানান, প্রণব মণ্ডলের জামিন, কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়া ও কাউকে না জানিয়ে ভারতে চলে যাওয়া সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না।

তিনিও প্রশ্ন করেন, বিজিবিকে না জানিয়ে কীভাবে সে দেশে ফিরল? তিনি বলেন, মামলা চলমান থাকায় প্রণব মণ্ডলকে বাংলাদেশেই থাকার নিয়ম।

আদালত ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ অক্টোবর সকালে রাজশাহীর চারঘাট সীমান্তে পদ্মার বালুঘাট এলাকায় বাংলাদেশি জলসীমায় অনুপ্রবেশ করে ভারতীয় একদল জেলে কারেন্ট জাল দিয়ে অবৈধভাবে ইলিশ ধরছিলেন। এঘটনা দেখতে পেয়ে রাজশাহীর চারঘাট ফাঁড়ির বিজিবি সদস্যরা ভারতীয় তিন জেলে অচিন্ত মণ্ডল, বিকাশ মণ্ডল ও প্রণব মণ্ডলকে নৌকা ও জালসহ আটক করেন।

ওই সময় বিজিবি সদস্যরা দুই ভারতীয় জেলে বিকাশ ও অচিন্ত মণ্ডলকে ছেড়ে দেন। তবে বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠকের পর প্রণব মণ্ডলকেও ছেড়ে দেয়া হবে বলে বিজিবি সদস্যরা জানান।

এদিকে নৌকা ও জালসহ ভারতীয় জেলে প্রণব মণ্ডলকে আটকের খবর পেয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গি থানার কাকমারী বিএসএফ ফাঁড়ির চার সদস্য বিজিবির অনুমতি ছাড়াই স্পিডবোটে বাংলাদেশের ভেতরে চলে আসেন। সেখানে প্রাথমিক কথাবার্তার পর বিএসএফ সদস্যরা আটক ভারতীয় জেলে প্রণব মণ্ডলকে জাল ও নৌকাসহ ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

এতে বাধা দিলে বিএসএফ সদস্যরা ঘটনাস্থল ত্যাগের সময় বিজিবিকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। বিজিবির সদস্যরাও পাল্টা গুলি করেন। এসময় বিএসএফের হেড কনস্টেবল বিজয় ভান সিংহ নিহত হন। আহত হয় আরও দুই বিএসএফ জওয়ান।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কে সাময়িকভাবে টানাপোড়েন হয়। অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ চলে এ নিয়ে। বিএসএফ-বিজিবি ডিজি পর্যায়ের সভাতেও বিষয়টি উঠে আসে। দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে চিঠি চালাচালি হয়।

এদিকে ঘটনার দিন রাতেই চারঘাট বিজিবি ফাঁড়ির হাবিলদার হুমায়ুন কবীর বাদী হয়ে ভারতীয় জেলে প্রণব মণ্ডল, অচিন্ত মণ্ডল, বিকাশ মণ্ডল ও অজ্ঞাত বিএসএফ সদস্যসহ সাতজনের বিরুদ্ধে চারঘাট থানায় অবৈধ অনুপ্রবেশ ও নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ শিকার ও বিজিবির ওপর গুলিবর্ষণের অভিযোগে দুটি মামলা দায়ের করেন।

গত ১৮ অক্টোবর প্রণব মণ্ডলকে আদালতের মাধ্যমে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। গত ডিসেম্বরে ভারতীয় নাগরিক প্রণব মণ্ডলসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুই মামলাতে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। মামলা দুটি বর্তমানে রাজশাহীর আদালতে বিচারাধীন।

এদিকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেলসুপার গিয়াস উদ্দিন জানান, গত ১৭ মার্চ ইন্তাজুল হক নামের একজন আইনজীবী ভারতীয় নাগরিক প্রণব মণ্ডলের জামিনের আবেদন করেন। ওইদিন একটি মামলায় তাকে জামিন দেয়া হয়। গত গত মার্চ আরেকটি মামলাতেও তার জামিন মঞ্জুর করেন রাজশাহীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক।

চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর গ্রামের নিতাই মণ্ডল আত্মীয় পরিচয় দিয়ে আদালতে হলফনামা দেন। তবে জামিননামায় স্বাক্ষর করেন চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর ইউপি সদস্য আবদুর রহিম।

জামিন মঞ্জুরের দিন বিকালেই প্রণব মণ্ডলকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জিম্মাদারের কাছে ছেড়ে দেয়া হয়। জামিনের শর্তে এই ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে আত্মীয় বাড়িতে অবস্থানের কথা বলা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে নিতাই মণ্ডলের বাড়িতে যান প্রণব মণ্ডল। সেখান থেকে গত ২৪ মার্চ রাতে ইউসুফপুর সীমান্ত দিয়ে সে ভারতে পালিয়ে যায়।

তবে প্রণব মণ্ডলের জামিনদার আবদুর রহিম বলেছেন, তিনি প্রণব মণ্ডলকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। নিতাই মণ্ডল তাকে অনুরোধ করায় তিনি জামিননামায় স্বাক্ষর করেছেন। প্রণব মণ্ডল ফিরবেন কিনা সে ব্যাপারে তিনি জানেন না।

তবে একটি গোয়েন্দা সংস্থা ইতিমধ্যে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন নিতাই মণ্ডল, ভারতীয় নাগরিক প্রণব মণ্ডলের আত্মীয় নন। আদালতে মিথ্যা হলফনামা দিয়েছেন নিতাই মণ্ডল। ঘটনা জানাজানির পর নিতাই মণ্ডল বাড়ি থেকে পালিয়েছেন।

এদিকে বিজিবি ১ ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক লে. কর্নেল ফেরদৌস জিয়াউদ্দিন মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, ভারতীয় নাগরিক প্রণব মণ্ডলকে গ্রেফতার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ও বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে একাধিক বৈঠকও হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় উচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। তবে প্রণব মণ্ডলকে ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি বিজিবি কর্তৃপক্ষকে কেউই অবহিত করেনি। যা করা উচিত ছিল।

ছাড়া পাওয়ার পর প্রণব মণ্ডল কীভাবে নিজের দেশে ফিরে গেলো এই প্রশ্নের জবাবে বিজিবি অধিনায়ক আরও বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রণব মণ্ডলকে জামিনের পর জিম্মাদারের কাছে তাকে বাংলাদেশেই থাকতে হবে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত। যেহেতু তার বিচার চলছে আদালতে। আর সাজাপ্রাপ্ত ভারতীয় নাগরিক হলে বিজিবির কাছে হস্তান্তরের নিয়ম। বিজিবি নিয়মানুযায়ী বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করে।

এদিকে ভারতে নিজ বাড়িতে ফিরে প্রণব মণ্ডল ২৫ মার্চ দুপুরে ভারতের দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তাকে রাজশাহীর ইউসুফপুর সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে সীমান্ত পার করে দেন একজন দালাল।

সীমান্ত অতিক্রম করেই তিনি বিএসএফের কাকমারী সীমান্ত ফাঁড়িতে চলে যান। সেখান থেকে বিএসএফ সদস্যরা ২৫ মার্চ ভোরে তাকে গাড়িতে করে বাড়িতে পৌঁছে দেন। প্রণব মণ্ডল বলেছেন, মামলা থাকলেও তিনি আর বাংলাদেশে ফিরবেন না।

Comments

comments