ছোট বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকাইতে পারি না

৪ঠা এপ্রিল, ২০২০। ডেটলাইন মিরপুর। যানজট নেই, হর্ণের তীব্র শব্দ নেই। একটু পরপর ব্যক্তিগত গাড়ির ছুটে যাওয়া। স্বল্প সংখ্যক রিকশা। মানুষের উপস্থিতি খুব বেশি নয়। এতো রাজপথের চিত্র। গলিতে ঢুকতেই ছবিটার একেবারেই আলাদা।

মিরপুরেই অফিসিয়ালি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি করোনা রোগী পাওয়া গেছে। মনিপুরী পাড়াতেও সন্ধান মিলেছে করোনা আক্রান্তের। কিন্তু মানুষের মাঝে খুব একটা সতর্কতা দেখা গেল না। রাস্তায় হুইল চেয়ারে সন্তানকে নিয়ে হাঁটছিলেন মা। দায়টা পেটের। তিনি বলেন, বাবারে মাইয়াটারে লইয়া কই যামু? কাম নাই। বাড়িত চাল নাই। জীবনে হাত পাতি নাই। এহন বাধ্য হইয়া বার হইলাম। চারটা খাওয়ের আশায়। তখন আসরের আজান হচ্ছিল মসজিদে। গলি ধরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি আর দেখছি অভুক্ত মানুষগুলো সড়কে রীতিমতো কাতরাচ্ছেন। এক মোড়ে দেখা মেলে বেশ কয়েকজনের। ছাপড়া বাড়ির সামনে বসে আছেন। তাদের মুখে নেই কোন হাসি। এরই মাঝে শোনা যায়, এক গৃহিণী স্বামীর হাতে মার খাচ্ছেন। সবাই এগিয়ে যাওয়াতে রক্ষা। পরে সেই নারী কাঁদতে কাঁদতে বাইরে এসে উচ্চ স্বরে বলছিলেন, ২ ট্যাকা নাই, ফুটানি দেখায়। চাল নাই রান্দুম কি? আমি কি চাল পয়দা করমু। এই দৃশ্য বেশি সময় দেখা যায় না। এগিয়ে চলেছি। দেখছি রাস্তার কুকুরগুলোও অভুক্ত। অলিগলি পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম মিরপুর ১। একটু জিরিয়ে নেবার পালা। চায়ের দোকানে চোখে পড়ল প্রায় ১০ জন মানুষের জটলা। খুবই সীমিত আকারে চলছে বেচাকেনা। প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন, যেকোন সময় বন্ধ করতে হতে পারে। সেই চায়ের আড্ডায় এক মধ্যবয়সী ব্যক্তির কথা শুনছিলাম মনোযোগ দিয়ে। বলতে শুনলাম, তিনি অনেক সময় অপেক্ষা করেও কোন সাহায্য পাননি। কিন্তু অন্যরা কয়েকটি সাহায্যের প্যাকেট নিয়ে গেছেন। এই ব্যক্তির নাম আলিম। কাজ করেন মার্কেট পরিষ্কারের। কিন্তু এখন কাজ বন্ধ। তিনি বলেন, আমরা দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ। বাড়িত কিছুই নাই। ছোট বাচ্চাটার মুখের দিক তাকাইতে পারি না। আজ কিছু না পাইলে না খাইয়া থাকতে হবে। সাইকেলটা নিয়ে এগুতে থাকলাম টেকনিক্যাল মোড়ের দিকে। অল্প কিছু যানবাহন। এরই মাঝে কিছু মোটর সাইকেল গতি প্রতিযোগিতা করছে। পুলিশের উপস্থিতি বেশ। বাঙলা কলেজের সামনে চোখে পড়ল ছোট একটা চিড়ার দোকান। প্লেট ১০ টাকা। এই চিড়ার দোকানে রীতিমতো লাইন ধরে খাচ্ছেন মানুষ। দোকানের পাশে এক ভিক্ষুক দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। কিন্তু তার দিকে নজর নেই অন্যদের। কাছে যেতেই বললেন, বাবা এক প্লেট চিড়া কিন্যা দেন। খামু। কাল রাত থেকে না খাওয়া। এক প্লেট চিড়া নেবার পর দেখলাম কিছুটা রেখে দিলেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন, রাইতে খামু। টেকনিক্যাল মোড়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন রিকশা চালক ও যাত্রী। কথা-কাটাকাটি চলছে। আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসায় থেমে গেলো তা। এরপর কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন রিকশা চালক। আরও দেখে ভালো লাগলো, ১০ টাকা বেশি ভাড়া চাওয়ায় যে বাক বিতণ্ডা করছিলেন তিনিই ৫০ টাকা দিলেন তাকে। এরপর সেই চালক পা ধরে মাপ চাইতে যান। যাত্রী আটকান তাকে। মাস্ক পরিহিত অবস্থায় মুখ না দেখা গেলেও চোখের কোণে পানি স্পষ্ট। গাবতলীতে যেতেই আরও ভয়াবহ চিত্র। গৃহহীন মানুষরা যেন ওত পেতে আছেন, একটু সাহায্যের আশায়। কারো চোখে আতঙ্ক নেই। সবার চোখে ক্ষুধা। একটু ভাতের আশা।

Comments

comments