কেমন যাচ্ছে ঘরবন্দী শিশুদের জীবন

গাছে পানি দিতে বা মুক্ত পাখিদের খাবার দিতে কিংবা কাপড় মেলতে বারান্দায় গেলে মাঝেমধ্যে পাশের বাসার বছর পাঁচেকের আবরারের সঙ্গে চোখাচোখি হতো। যখন সে অনেক ছোট ছিল, আধো আধো কথা শিখেছিল, তখন থেকেই সে আমাকে ‘গাছদাদু’ ডাকে। এখন স্কুলে যায়, তাই বোধ হয় সময়ের অভাবে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে। ‘গাছদাদু’ বলে ডাকতে কি সে এখন একটু লজ্জা পায়? কি জানি।

ঘরবন্দীর তৃতীয় দিনে বারান্দায় যেতেই আমাকে চমকে দিয়ে আবরার বলল, ‘আমার সঙ্গে একটু কথা বলবে দাদু?’ যে শিশু এই সেদিনও চোখাচোখি হলেই ব্যস্ততা দেখিয়ে ঘরে ঢুকে যেত। সে এখন দরখাস্ত করছে কথা বলার! তার আচরণে অতিষ্ঠ মা–বাবা তাকে বারান্দাবন্দী করেছেন সকাল থেকেই। আবদারের সুরে বলল, ‘দাদু, আমি নানুর কাছে যাব। আমাকে এরা যেতে দেয় না, নানুও আসে না।’ কয়েকটি বাড়ি পরেই তার নানা–নানু থাকেন। ঢাকায় স্ত্রী–স্বামী দুজনেই কাজ করলে তাঁরা চেষ্টা করেন মা-বাবা কিংবা শ্বশুর–শাশুড়ির বাড়ির কাছাকাছি থাকতে। আবরারের নানু তাকে স্কুল থেকে নিয়ে এসে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজের কাছেই রাখতেন। বাড়ির কাজ, দুপুরের খাওয়া, ঘুম সব ছিল তার নানুর সঙ্গে। স্কুল ছুটি মানেই নানু। দুপুর মানেই নানু, নানুর হাতে দুপুরের খাওয়া তার অভ্যাস। এটিকে আবরার তার অধিকার মনে করে। ‘দুই হাত’ দূরে তাঁর নানুর বাসা কিন্তু যাওয়া যাবে না। আমি কপট প্রশ্ন করে বলি, ‘ভাইয়া, কেন তোমাকে যেতে দিচ্ছে না?’ সে বলল, ‘আম্মু বলেছে পুলিশে ধরবে। বাট আমি পুলিশকে ভয় পাই না। পুলিশ বাচ্চাদের মারে না, ওদেরও বাচ্চা আছে। সাইফুলের বাবা পুলিশ। ওর বাবা ওকে অনেক আদর করে।’

আবরার টেলিভিশনে পুলিশের মারপিট, কান ধরে ওঠবসের ছবি দেখেছে বলে জানাল। তারপরও তার বিশ্বাস পুলিশ তাকে বাধা দেবে না। আমি কি তাকে একটু তার নানুর বাসায় দিয়ে আসতে পারব? অনুনয়ের সুরে আবরার জানতে চায়। আমি অজুহাত খুঁজি ‘হ্যাঁ, দেখো না। আমি তো আমার মেয়ের বাড়ি মানে তোমার পুষ্পা ফুপির বাসায় যেতে পারছি না। ভয়ে।’ ‘তোমার আবার কিসের ভয়’ কেউ কিছু করলে টকশোতে গিয়ে নাম বলে দেবে। না হলে মারবে ঢিসুমঢাসুম।’ সে হাত–পা নাড়িয়ে শূন্যে ছুড়ে আমাকে দেখায়।

আমাদের কথোপকথন যখন সলাপরামর্শের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, তখন নিচের ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে আরেক শিশু জাইমার চিল্লাচিল্লি। সে গ্রিলে লাঠি দিয়ে বাড়ি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। ‘এই দাদু, আমার সঙ্গে কথা বলো, এই যে আমি তিনতলার জাইমা।’

ততক্ষণে আবরার ক্লান্ত হয়ে তাদের বারান্দায় ধপাস করে বসে পড়েছে। সে বলল, ‘তুমিও হাঁপায় যাইবা একটা চেয়ার নিয়ে বসো। আমরা কথা বলি।’

কথা শোনা যায় কিন্তু দেখা যায় না কাউকে। তিনতলার জাইমাকে দেখতে হলে গ্রিল ফাঁক করে মাথা বের করতে হবে। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না কিন্তু কথা বলছি। যেন একাত্তরের অন্ধকার বন্দিখানায় নিশুতি রাতে দেয়ালে টোকা দিয়ে অন্য বন্দীদের সঙ্গে কথা বলা।

এভাবে ঘরবন্দী, বাড়িবন্দী, বাক্সবন্দী শিশু বা কিশোর বয়সের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বিপাকে আছে মা–বাবা, দাদা–দাদি, নানি–নানার দল। যেখানে মা একলা অথবা মা নেই, বাবা একলা। সেখানকার পরিস্থিতি অন্যদের থেকে আলাদা। পরিবারে শিশু–কিশোরদের সংখ্যা ভাইবোনদের বয়সের তারতম্য ইত্যাদি নিয়েও পরিস্থিতির রকমফের আছে। রকমফের আছে নগর আর গ্রামের শহর আর গঞ্জের। রোজ দিনের অভ্যস্ত জীবনের ধারাপাত রাতারাতি এভাবে ওলট–পালট হয়ে যাবে, সেটা কেউ কখনো ভাবেনি। শিশুদের বন্দী অবস্থা কথিত ‘লকডাউন’–এর দিন দশেক আগে থেকেই শুরু হয়।

অনেক সচেতন অভিভাবকের জানা নেই কী করতে হবে। কেমন করে বাড়ির সব বয়সের ছেলেমেয়েদের তাজা রাখতে হবে। মন মরা পরিস্থিতির সংকটে না ফেলা কীভাবে তাদের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদেরও হাসিখুশি থাকতে হবে। দুজনেই মানবাধিকারের পাঠ নেওয়া জসিম দম্পতি প্রথমে মনে করেছিলেন, এটা কোনো ব্যাপার না। একটা সন্তান তাঁদের। তাঁরা ভেবেছিলেন, তাঁরা উদাহরণ তৈরি করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবেন। প্রথম দিন শুরু করেছিলেন ক্রেয়ন (একধরনের নরম রঙিন পেনসিল), কাগজ আর খেলনা ইত্যাদি দিয়ে বসিয়ে দিয়ে। তাদের সন্তান এখন পাঁচ বছর পূর্ণ করেনি। তিন দিনের মাথায় তাঁরা হাঁপিয়ে উঠেছেন। রংপেনসিলের দাগ এখন আর শুধু কাগজ, জামা আর বিছানার চাদরে সীমাবদ্ধ নেই। ঘরের সব দেয়ালে তার আসর পড়েছে। প্রথম দুই দিন তার আঁকার মধ্যে আঁকার বলে একটা বস্তু ছিল এখন শুধুই হিজিবিজি। যেন অতি দ্রুত সে রঙের মজুত শেষ করে অন্য কিছু করার তাড়ায় আছে। দ্রুত হাতে হিজিবিজি আঁকা কিন্তু শিশুর মনের মধ্যে একটা ভাঙচুর চলার ইঙ্গিত দেয়। বোঝা যায় তাকে দেওয়া কাজটিতে সে আর মজা পাচ্ছে না।

মন খারাপ করার কিছু নেই। করোনা পরিস্থিতি সারা পৃথিবীর জন্যই একটা আনকোরা পরীক্ষা। মানুষের অসাধ্য বলে কি কিছু আছে? যাঁরা সিনেমার খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা নিশ্চয় বিখ্যাত ছায়াছবি ‘দ্য সাউন্ড অব মিউজিক’ দেখেছেন বা নাম শুনেছেন। অস্ট্রিয়ার সলজবুর্গ শহরের এক বিপত্নীক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ফন ট্রেপ সাহেবের নানা বয়সের অবিশ্বাস্য রকমের বেপরোয়া সাত শিশু-কিশোর সন্তান এবং তাদের দেখাশোনা (মানুষ করার) চ্যালেঞ্জ ঘিরে ছবিটি আবর্তিত। ছবিতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে ম্যারিয়া নামের এক অভিজ্ঞতাহীন গভর্ন্যান্স কেবল অপরিসীম ধৈর্য আর ইচ্ছাশক্তি দিয়ে শিশুদের নানা সৃষ্টিশীল কিন্তু উপভোগ্য কাজে মনোযোগী করে তোলেন। তাদের নানা রকমের স্বাধীনতা দিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তার পরিবেশ প্রসারিত করেন। শিশুরা ক্রমেই ভক্তে পরিণত হয় ম্যারিয়ার। অথচ তারা (শিশুরা) তাঁকে প্রথম দিনেই বিদায় করে দেওয়ার বুদ্ধি এঁটেছিল।

১৯৩০ সালের এই গল্প নিয়ে ছবি মুক্তি পায় ১৯৬৫ সালে। জার্মান আর ইংরেজি ভাষায় নির্মিত এ ছায়াছবিটির একটা দুর্বল কিন্তু ব্যবসাসফল নকল হয় কলকাতায়। সেই টলিউডী বায়োস্কোপ মুক্তি পায় ১৯৭১ সালে। ‘জয়জয়ন্তী’ নামের সেই বায়স্কোপে উত্তমকুমারের সঙ্গে ছিলেন অপর্ণা সেন। মূল ছবিতে ফন ট্রেপ সাহেবের সাত ছেলেমেয়ে থাকলেও এখানে উত্তমকুমারের পাঁচ ভাগনে–ভাগনি দেখানো হয়েছে। ‘দ্য সাউন্ড অব মিউজিক’ জোগাড় বা ডাউনলোড করতে না পারলে অগত্যা ছেলেমেয়েদের নিয়ে এই করোনাকালে ‘জয় জয়ন্তী’ দেখতে পারেন। মূল ছবির মতো এই নকল ছবিটার শিশুতোষ গানগুলোও সহজে ভোলার নয়। সংগীত পরিচালক হিসেবে মানবেন্দ্রের এ এক অপূর্ব সৃষ্টি। ছেলেমেয়েদের নিয়ে এই বেদরদি সময়ে ছবিটি দেখলে, আমার ধারণা, এই ছবির স্মৃতি সবাই অনেক বছর মনে রাখবেন।

Comments

comments