করোনায় রমজানের প্রস্তুতির কিছু পরামর্শ

মুহাম্মদ ছফিউল্লাহ হাশেমী

বৈশ্বিক মহামারী করোনায় লকডাউনে অবস্থান করছে প্রায় পুরো বিশ্ব। এরই মাঝে বছরপরিক্রমায় আমাদের মাঝে আগমন করতে যাচ্ছে সিয়াম সাধনার মাস রমজান। রমজান এমন এক আকাক্সিক্ষত মাস যার আগমনে সমগ্র মুসলিম মিল্লাত নব উদ্যমে জেগে উঠে। এ বছর মহামারী করোনার কারণে রহমতের মাস রমজানের বেশ কিছু ইবাদতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তাই মহিমান্বিত এ মাসকে বরণ করার জন্য উপযুক্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা আমাদের সবার ঈমানি দায়িত্ব।

রমজান এমনই এক বরকতময় মাস, যার আগমনে পুলকিত হয়ে স্বয়ং রাসূল সা: সাহাবায়ে কেরামকে মুবারকবাদ দিয়ে সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন ‘তোমাদের সামনে রমজানের পবিত্র মাস আগমন করেছে, যে মাসে আল্লাহতায়ালা তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম)

তাই এ পবিত্র মাসে ইবাদত-বন্দেগি তথা সাহরি, ইফতার, তারাবিহ, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, ইতিকাফ, তাহাজ্জুদ, জিকির-আসকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-ইস্তিগফার, ফিতরা, দান-সদকা ইত্যাদি আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য বাঞ্ছনীয়।

মাহে রমজানের বরকতময় মুহূর্তগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কিছু করণীয় তুলে ধরা হলো:

  • মাহে রমজানকে সামনে রেখে সর্বপ্রথম মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। করোনা পরিস্থিতিতে বরকতময় এ মাসকে কিভাবে অতিবাহিত করব, অন্য সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত কী করব এবং স্বাভাবিক আমলের অতিরিক্ত আর কী আমল হবে? সে পরিকল্পনা এখন থেকেই ঠিক করে নেয়া প্রয়োজন।

 

  • করোনা পরিস্থিতিতে হোম কোয়ারেন্টিনের দিনগুলোতে মাহে রমজানের প্রতিদিন কিছু সময় দ্বীনি বিষয়ে ঘরোয়া তালিমের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বাবা-মা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। পরিবারে এমন একটি রুটিন করে নেয়া যেতে পারে, যাতে ঘরোয়া কাজের কারণে ইবাদতে ব্যাঘাত না ঘটে। একটি মুহূর্তও যেন নফল ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত ও জিকিরমুক্ত না হয়।
  • ঈদের কেনাকাটা কমিয়ে বেশি বেশি দান করার চেষ্টা করা। করোনার কারণে এ বছর এমনিতেই বড় বড় শপিং সেন্টারগুলো ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি অনুকূলে না এলে সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে এসব শপিং সেন্টার আর খুলবেও না। যদিও স্বল্প পরিসরে এসব শপিং সেন্টার খোলা থাকে, তাতেও বিচরণ কিংবা যাওয়া-আসায় ব্যাপক ঝুঁঁকি থেকেই যাবে। তাই এ বছর ঈদের কেনাকাটা কমিয়ে অসহায়-দরিদ্রদের দান করার পরিকল্পনা করা উচিত। কেননা, এ সময়ে মানুষ তার চাকরি হারাচ্ছে এবং খাবারের কষ্ট পাচ্ছে। এখন এমন অনেকেই আছেন তারা জানেন না, কোথায় গেলে তার এক বেলার আহার জুটবে। তাই দান-সদকা ও জাকাত দেয়ার প্রয়োজন এই মুহূর্তেই সবচেয়ে বেশি। এই মুহূর্তে আমরা যারা ধনী বা সচ্ছল আছি, আমাদের উচিত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া।
  • পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের জন্য একটি সময় নির্ধারণ করা। কুরআন তিলাওয়াত না জানলে শেখার পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
  • বেশি বেশি ইসলামী বই-পত্র অধ্যয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত রমজানের প্রয়োজনীয় মাসায়েল জেনে নেয়া। প্রয়োজনে রমজানের আগেই এ বিষয়ে কিছু বই-পত্র কিনে নেয়া যায়, যাতে পরিবারের অন্য সদস্যরাও তা পড়তে পারে।
  • সময়-সুযোগ থাকলে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করার নিয়ত করা যেতে পারে। তবে করোনা পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে না এলে মসজিদে ইতিকাফ করা সম্ভব না হলে ব্যক্তি উদ্যোগে ঘরে কিংবা নির্জন পরিবেশে যথাযথ দূরত্ব বজায় রেখে বিশেষ সতর্কতার সাথে ইতিকাফ করা যেতে পারে।
  • কোনো বদভ্যাস থাকলে তা ত্যাগ করার বিশেষ পরিকল্পনা নিতে হবে।
  • মাহে রমজানে সালাতুত তারাবিহ একটি ফজিলতপূর্ণ বিশেষ ইবাদত। বিশ্বব্যাপী দীর্ঘ সময়ে পবিত্র কুরআন খতমের মাধ্যমে এ নামাজ আদায় করা হয়। তারাবিহ নামাজের সময় মসজিদে ব্যাপক জনসমাগম হয়। কিন্তু এ বছর করোনার কারণে লকডাউন পরিস্থিতিতে হয়তো মসজিদে তারাবিহ আদায় করা সম্ভব হবে না। তাই ঘরে একাকী স্বল্প পরিসরে এ নামাজ আদায় করতে হবে। এ জন্য এখন থেকেই আমাদেরকে এ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
  • গুরুত্বপূর্ণ দোয়া ও তাসবিহগুলো রমজানের আগেই শিখে নেয়ার চেষ্টা করা।

নেক কাজের পরিকল্পনাও একটি নেক কাজ। তাই আসুন রমজানের আগেই রমজানকে বরণ করে নেয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করি। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুসলিম উম্মাহকে রমজানের আগেই প্রাণঘাতী মহামারী করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি দিন। রমজানের রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাধ্যমে দুনিয়া ও পরকালীন কল্যাণ লাভের তাওফিক দান করুন।

আমিন!

Comments

comments