‘মরে গেলে প্রণোদনা দিয়ে কী করবো?’

বাংলাদেশে এক গবেষণা বলছে, হাসপাতালের স্বাস্থ্য-কর্মীরা পরিবারের সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে তীব্র মানসিক চাপে রয়েছেন। আর্থিক প্রণোদনার বদলে তারা চান উপযুক্ত পিপিই – অর্থাৎ করোনাভাইরাস সংক্রমণ-প্রতিরোধী পোশাক ও অন্যান্য সরঞ্জাম।

গবেষণা বা সমীক্ষাটি যৌথভাবে করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ।

কোভিড-১৯ চিকিৎসার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত – এমন মোট ৬০ জন ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্য-কর্মীর সাথে ফোনে সাক্ষাৎকার নেয়া হয় এ সমীক্ষায়। ঐ সব সাক্ষাৎকারে ফ্রন্টলাইনের স্বাস্থ্যকর্মীরা ‘উপযুক্ত মানের পিপিইর জরুরী প্রয়োজনের” কথা উল্লেখ করেন।

তারা সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার চাইতেও পিপিই (পার্সোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট)-কে বেশি গুরুত্ব দেন। তারা বলেন, পরিবারের সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে তাদেরকে তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে দিনযাপন করতে হচ্ছে।

‘মরে গেলে প্রণোদনা দিয়ে কী করবো?’

ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বেশ কজন ডাক্তার তাদের এবং তাদের পরিবারের সুরক্ষা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের একজন চিকিৎসক, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রণোদনার দরকার নেই, আমাদের দরকার সুরক্ষার। মরে গেলে প্রণোদনা দিয়ে কী করবো।”

ঐ চিকিৎসক বলেন, ঢাকার এই হাসপাতালটিকে করোনাভা‌ইরাস চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত করার সিদ্ধান্ত হলেও হাসপাতালে একটিও এন৯৫ মাস্ক নেই।

তিনি জানান, সম্প্রতি কিছু মাস্ক তাদের হাসপাতালে পাঠানো হলেও ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। কিন্তু পরে তার বিকল্প কিছু এখনও আসেনি।

“এন৯৫ বা সমমানের ফেসমাস্ক এ ধরণের সংক্রমণের চিকিৎসায় আবশ্যকীয় একটি বস্তু, এটা ছাড়া চিকিৎসা করতে যাওয়া আর সুইসাইড মিশনে যাওয়া একই কথা।” মাস্ক নিয়ে ঐ হাসপাতালের পরিচালকের সাথে ফোনে কথা বলার চেষ্টা হলেও, তিনি ফোন তোলেননি।

একশরও বেশি ডাক্তার সংক্রমিত
ডাক্তার এবং মেডিকেল ছাত্রদের সংগঠন বিডিএফ বলছে অনলাইনে তাদের এক চলতি জরীপে অংশ নেওয়া সদস্যদের ৯৫ শতাংশই তাদের সুরক্ষা নিয়ে শঙ্কার কথা বলেছেন।

সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. নিরুপম দাস বিবিসিকে বলেন, সারাদেশ থেকে তাদের শাখাগুলোর মাধ্যমে পাওয়া তথ্যমতে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১০৬ জন ডাক্তার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

ডা.দাস বলেন, ডাক্তাররা অবশ্যই শঙ্কিত। বেসরকারি অধিকাংশ হাসপাতালে পিপিই বলতে গেলে নেই। সরকারি হাসপাতালে যা গেছে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম এবং অধিকাংশই অসম্পূর্ণ।

“এস৯৫ মাস্ক, গগলস এবং ফেস শিল্ড ডাক্তারদের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর দারুণ ঘাটতির কথা বলছেন আমাদের সদস্যরা।” ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালের শূন্য ওয়ার্ড। সংক্রমণের ভয়ে রোগীরা আসছেন না, নতুন রোগী ভর্তিও করা হচ্ছেনা।

আটজনের ইউনিটে দুটো ‘অসম্পূর্ণ’ পিপিই
নোয়াখালির ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের অ্যানেসথেশিয়া বিভাগের চিকিৎসক ডা. আবু তাহের বিবিসিকে বলেন, তার বিভাগে আটজন চিকিৎসকের জন্য তারা দুটো মাত্র পিপিই পেয়েছেন যেগুলো, তার মতে, অসম্পূর্ণ। যে মাস্ক দেওয়া হয়েছে তা কোনোভাবেই এন৯৫ বা সমমানের নয়।

“শুধু এই হাসপাতালের কথাই নয়, আমার পরিচিত যত ডাক্তার বিভিন্ন জেলায় আছেন তারা কেউই যে এন৯৫ মানের মাস্ক পেয়েছেন শুনিনি।”

নোয়াখালির এই হাসপাতালে সম্প্রতি গত সপ্তাহে একজন কোভিড১৯ রোগী মারা যাওয়ার পর পুরো মেডিসিন ওয়ার্ড লক-ডাউন করা হয়।

“ভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে গেছে। অনেক মানুষ কোনো উপসর্গ ছাড়াই হাসপাতালে হাজির হচ্ছেন। ফলে, আমরা ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতালে কাজ করছি। সবাই উদ্বিগ্ন । আমার দুটো বাচ্চা, স্ত্রী কান্নাকাটি করে…।”

সরকার পিপিইর সংকট নিয়ে সত্য বলছে না – ফেসবুকে এরকম একটি পোস্ট দেওয়ার কারণে ডা. তাহেরকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়েছে। তারপরও তিনি বিবিসির কাছে অভিজ্ঞতা জানাতে রাজী হন।

“শুধু আমরাই ঝুঁকিতে আছি তা নয়, জনগণও ঝুঁকিতে, আমরা নিরাপদ না থাকলে তারাও তো নিরাপদ থাকতে পারবেনা”

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা রিপোর্টে সুপারিশ করা হয়েছে যে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় জড়িত ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্য-কর্মীদের ‘পর্যাপ্ত এবং সঠিক’ পিপিই সরবরাহ করা ছাড়াও তাদের দুশ্চিন্তা কমাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ।

যেমন, তাদের কর্মস্থলের কাছাকাছি বাসস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন এবং চীনের উহানের মত ৭/১৪ মডেল অনুসরণ করা উচিৎ যেখানে স্বাস্থ্য-কর্মীরা টানা সাতদিন কাজ করার পর ১৪দিন কোয়ারেন্টিনে থাকবেন।

Comments

comments