কৃষকের ধান কাটায় সহযোগিতা করলেন নানা পেশার মানুষ

সুনামগঞ্জের হাওরে কৃষি শ্রমিক সংকটের কারনে বোরো ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদার পরিমাণ শ্রমিক না থাকায় আশানুরুপ ফসল উঠছে না কৃষকের গোলায়। এ কারণে ফসল কাটার আনন্দ ক্রমেই ম্লান হয়ে পড়ছে কৃষকদের। প্রতি বছরের তুলনায় চলতি বোরো মৌসুমে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বেশ কয়েকটি জেলা থেকে এবার ধান কাটার শ্রমিক দল কম এসেছেন। গৃহস্থরা দলীয় শ্রমিকদের কয়েক ভাগে ভাগ করে ধান কাটাচ্ছেন। এতে প্রতিদিন গড়ে যে পরিমাণ ধান ফসলী জমি থেকে মাড়াই খলায় উঠে আসার কথা, তা আসছে না। এতে চিন্তিত হয়ে পড়ছেন কৃষকরা।

তবে বিভিন্ন উপজেলায় ও জামালগঞ্জে পাকনা হাওর, হালির হাওরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা পালের তদারকিতে প্রায় ১২-১৩ শ’ভলানটিয়ার ৪ টি টিমে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তার নেতৃত্বে কৃষকদের ধান কাটতে দেখা গেছে। এতে মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র-শিক্ষক অনসার, সহ উপজেলার সেচ্ছাসেবকবৃন্দ সেচ্ছায় ধান কাটছেন। চৈত্রের প্রচণ্ড তাপদাহে কিছু জমিতে চিটা, কাল বৈশাখী ঝড় ও শিলা বৃষ্টিতে উঠতি বোরো ফসল আংশিক ক্ষতি হলেও মাঠ ভরা পাকা ধান নিয়ে এখন চরম সংশয়ে রয়েছেন কৃষকরা। বহু কৃষক পাকা ধান কাটাতে শ্রমিকের খোঁজে দ্বিগবিদ্বিগ ছুটছে বেড়াচ্ছেন। সময়মতো ফসল ঘরে তোলার অতঙ্ক যেন পিছু ছাড়ছেনা তাদের। সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৫৪ টি হাওরে ২ লাখ ২৪ হাজার ৭১৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ ৩২ হাজার ৭৯২ মেট্রিক টন। টাকার অংকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

হাওর এলাকা ঘুরে কৃষক ও গৃহস্থদের সাথে আলাপকালে এই প্রতিবেদক কে তারা জানান, চৈত্রের খড়ায় আংশিক ধানে চিটা হওয়ায়, গড়ে চার আনা ফসল নষ্ট হয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার ফলন মোটামুটি ভালো হলেও ধান কাটার শ্রমিক খুব কম এসেছেন। এক-একজন গৃহস্থের কম পক্ষে ২০-৩০ জন ধান কাটার শ্রমিক প্রয়োজন। সেখানে অনেকই এবার শ্রমিক না পাওয়ার কারনে একজন গৃহস্থের শ্রমিক কে ভাগ করে কয়েক জন গৃহস্থ ধান কাটাচ্ছেন। আবার এলাকার আংশিক শ্রমিক ৫-৬ শত টাকা রোজ হারে যে পরিমাণ ধান কাটেন, এতে কৃষকদের ধান কাটা ও রোজের পারিশ্রমিক গড়-পরতায় পোষায়না। তাই প্রতি দিন আশানুরুপ ফসল ঘরে উঠছেনা। আবার অনেকেই শ্রমিক না পেয়ে নিজেরাই কিছু ধান কাটছেন এত লাভের চেয়ে লোকশানের পরিমান বেশী হচ্ছে।

ধান কাটতে যাওযা এলাকার কৃষি শ্রমিক হারুন মিয়া বলেন, আমরা তো সারা বছর কাম (কাজ) করতে পারি না। বৈশাখ মাসে যে রোজি করি বউ-বাচ্চা নিয়া খাই, এই সময় ৫-৬ টাকা রোজ পড়ে। ময়মনসিংহ থেকে আসা ধান কাটার শ্রমিক সর্দার ঠান্ডু মিয়া ( ঠান্ডু বেপারী ) জানান, তার নেতৃত্বে প্রতিবছরই ৩০-৩২ জনের একটি দল জামালগঞ্জের পাকনা হাওরে আসেন একজন (কৃষক) মহাজনের ধানী জমি কাটতে। কিন্তু এবার তিনি কয়েক জন কৃষকের ধান কাটছেন উপদলে বিভক্ত হয়ে। এতে তাদের কোনো রকম কমতি না হলেও, কৃষকদের (গৃহস্থ) কৃষি জমি থেকে সময়মতো ফসল উঠছে না। বিলম্বে ধান কাটলে বেশী পাকা ধান জমিতেই ঝড়েপড়ে, এতে ক্ষতি শুধুই কৃষকদের।

ফসল তোলার কজে ব্যস্ত গজারিয়া গ্রামের কৃষাণী নুরুন্নেছা বিবি বলেন, বৈশাখ মাসে সারা দিন খামকাজ করলেও কষ্ট লাগেনা। বেপারীসহ (ধান কাটার শ্রমিক) কত জনের রান্দা (রান্না) করি, ধান হুকাই (শুকাই), ধান ( চিটা ও চোঁছা ছাড়ানো ) উড়াই, কত খামকাজ করি কোন খামই শরীলে লাগেনা। কৃষক-কৃষাণীদের সাথে কাজে সহযোগী করছে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরা। হাওর পাড়ের স্কুল শিক্ষার্থীরা বৈশাখে ফসল তোলার এই মাসে তারাও বাড়ীতে সংসারিক কাজে সহযোগতিা করছে।

এদিকে, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন হাওরের ধান কাটার শ্রমিক সংকট নিরসনের জন্য ৩০ টি ধান কাটার মেশিন এসে বিভিন্ন উপজেলায় ধান কাটাছেন। এছাড়াও ৭-৮ বছর পূর্বে যুগ-যুগ ধরে ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, বাজিতপুর, ময়মনংসিহ, সহ দেশের বিভিন্ন জেলার লোকজন দল বেঁধে আসত সুনামগঞ্জের হাওরে ধান কাটতে। এখন আর আগের মতো তারা না আাসার কারণে শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারন করেছে।

জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা পাল বলেন, প্রায় ১২-১৩ শ’ ভলানটিয়ার ৪ টি টিমে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দের নেতৃত্বে কৃষকদের ধান কাটা হচ্ছে। এতে মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র-শিক্ষক অনসার, সহ উপজেলার সেচ্ছা সেবকবৃন্দ সেচ্ছায়ধান কাঠছেন। এটি শেষ পর্যন্ত সেচ্ছায় কাজ চলবে। যারা হাওরের ধান কাটবে তাদেরকে সরকারি সাহায্যের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সফর উদ্দিন বলেন, হাওরের ধান কাটতে শ্রমিক ও কৃষককে প্রতিদিনই উৎসাহিত করছি। ধান কাটতে মাইকিং করা হচ্ছে। ত্রাণের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে ধান কাটার শ্রমিকদের। তাছাড়া বাইরের জেলা থেকে অন্তত কয়েক হাজার শ্রমিক জেলায় প্রবেশ করেছে। কিছু এলাকায় ধান কাটার মেশিনের ব্যবস্থা রয়েছে।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ নয়া দিগন্ত বলেন, করোনাভাইরাস আমাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনে ছন্দপতন ঘটিয়েছে। জীবন পরিচালনা আরো কঠিন হয়েছে। আমাদের খাদ্য উদ্ধুত্ত জেলার হাওরে বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। উতোমধ্যে ৩০ টি ধান কাটার মেশিন বিভিন্ন উপজেলার হাওরে ধান কাটছে। এই অবস্থায় কৃষকদের সাহস ও শ্রমিকদের উৎসাহ দিতে হাওরে নেমে তাদেরকে উৎসাহ দিচ্ছি। হাওরের ধান তোলতে পারলে আমাদের কোনো অভাব থাকবে না।

Comments

comments