ফেরাউনের দেশে করোনাভাইরাস

মো: বজলুর রশীদ

নীল নদের পানি রক্তে পরিণত হয়েছিল আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে, ফেরাউন শাসক রামসিস-২ এর রাজত্বকালে। তাকে মূসা আ: একত্ববাদের দাওয়াত দিয়েছিলেন। আধুনিককালে বিজ্ঞানীরা মিসরের ফেরাউনের বসবাসের স্থান ও নদীর লাল বিষাক্ত বর্ণ বা রক্তেরও পরীক্ষা চালায়। জীববিজ্ঞানীরা নীল নদে ভাইরাসের চেইন রিঅ্যাকশন দেখতে পান।

পরীক্ষাকাজে ইহুদি বিজ্ঞানীরাও গবেষণায় ছিলেন। তারা মিসরে ১০টি প্লেগের কথা উল্লেখ করেন। এগুলো মূলত বাইবেলে উল্লেখ রয়েছে। কুরআনে আল্লাহ বলেন ‘আমি তাদের ওপর প্রেরণ করলাম তুফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ এবং রক্ত প্রভৃতি বহুবিধ নিদর্শন একের পর এক।’ (সূরা আরাফ : ১৩৩-১৩৫) আয়াতে পাঁচটি প্লেগের নাম উল্লেখ থাকলেও আরো নিদর্শনের কথাও বলা হয়েছে।

প্রাচীন মিসরে ফেরাউনের কিবতি লোকজনই ছিল সেরা মানুষ ও কৌলীন। এ জন্য তারা ইসরাইলিদের দাস হিসেবে ব্যবহার ও নির্যাতন করত। ১৯৯০ সালে ভূতত্ত্ববিদরা খুঁড়াখুঁড়ি করে দুটি শহরের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন, প্রিতম ও রেমসিস। প্রিতমের চেয়ে রেমসিস অনেক বড় নগর। এগুলো বতর্মান নীল নদের ডেল্টায় অবস্থিত। নানা যন্ত্রপাতির সাথে তারা সিজিয়াম মেগনেটোমিটারও ব্যবহার করে। মাটির পাঁচ মিটার নিচে এই যন্ত্রের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা বিল্ডিয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পান। এই যন্ত্রটি অনেকটা এক্স-রে মেশিনের মতো কাজ করে। মাটির নিচের বিল্ডিং ও অবকাঠামোর ছবিও তুলতে পারে। ছবি দেখে ভূতত্ত্ববিদরা অবাক হন, নতুন এক শহর, শ্রমিকদের থাকার ছোট কুঠুরি, বড় গ্রাউন্ড, অ্যাভিনিউ, নানা কিছু। অনেক বড় শহর ৩০ বর্গকিলোমিটার। নীল নদ তখন ওই শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যেত। বিজ্ঞানীরা তার ছবিও এঁকেছেন। পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের কাছেও নগরটি সুপরিচিত ছিল। বিশ্রামখানা, হোটেল নানা রকম ফলমূল, মদ ও রুটির জন্য বিখ্যাত ছিল মিসরের রেমসিস নগর। কোনো অভাব ছিল না, দুঃখ-কষ্ট ছিল না। শহরকে বলা হতো প্যরাডাইজ।

হঠাৎ নেমে আসে দুর্যোগ। বাইবেল বলে, মূসা আ:-এর লাঠির এক ছোঁয়ায় নীল নদের পানি রক্তাত হয়ে যায়। মিসরের মানুষের জন্য এটাই প্রথম প্লেগ বা ‘তাউন’। রক্তাক্ত পানি জীবনের পরিবর্তে জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চারদিকে মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। মরতে থাকে পশু, মাছ ও মানুষ। জেরুসালেম টেম্পল স্কুল ‘রক্ত পানি’ নিয়ে গবেষণা চালিয়েছে। বার্লিনের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার ইকোলজি ও ইনল্যান্ড ফিশারিও গবেষণা করেছে।

এখানের বিজ্ঞানীরা মনে করেন, নীল নদের পানি রক্তবর্ণের জন্য বিষাক্ত ব্লু আলজি দায়ী। বিজ্ঞানীরা বারগেন্ডি ব্লাড আলজি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এটি আসলে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। এই আলজি তিন হাজার বছর আগেই দেখা গিয়েছিল। এটি খুবই বিষাক্ত ও রক্তবর্ণের। বায়োলজিস্ট ফ্লুন বিবলিকাল এই রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, নীল নদের রক্ত লাল হয়েছিল বারগেন্ডি ব্লাড আলজির কারণে। এটি বিষাক্ত রক্তের মতো লাল ও দোদুল্যমান থাকে। এটি দেখতে অতি সুন্দর সায়ানো ব্যাকটেরিয়ার একটি প্রজাতি। আস্তে আস্তে প্রবাহিত খুব হাল্কা কুসুম গরম পানিতে অতি দ্রুত বংশবিস্তার করতে সক্ষম। শুধু নীল নদ নয়, পশ্চিম ফ্লোরিডার সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায়ও বিজ্ঞানীরা একই জিনিসের সাক্ষাৎ পান। বিপজ্জনক লাল আলজি সেখানে ফুটে উঠতে দেখেছেন যা বংশবিস্তার করলে মারাত্মক পরিণতি আনতে পারে, এই ব্লাড আলজি ফেরাউনের সভ্যতাকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল।

এখন বোঝা যাচ্ছে, নীল নদে বংশবিস্তারের সময় আশপাশের পানিতেও এটি বংশবিস্তার করেছিল। বিষাক্ত এই প্রবাহকে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘লাল ঢেউ’। আলজি গভীর জলে দেখা যায় না। গভীর পানিতে এটি বর্ণহীন থাকে।

প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের অভাবেও এটি বিস্তার লাভ করে না। পক্ষান্তরে নির্দিষ্ট খাদ্য উপাদান পেলে আরো রক্ত লাল ও জীবন বিধ্বংসী হয়ে উঠে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গভীরতায় ও বিভিন্ন স্থান থেকে ব্লাড আলজির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছেন- কিভাবে এই ভয়ঙ্কর ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়। আলেন চেন বেল্লা বিশ্বের প্রথম সারির একজন বিষাক্ত আলজি গবেষক। তিনি বলেছেন, আলজি কোনো কোনো সময় পানির ওপরে লাল কভার সৃষ্টি করে, এতেও পানি লাল দেখায়। অনেক সময় পানিতেই ঘোরাফেরা করে কোনো রঙ বা কভার সৃষ্টি না করে। করোনিয়া ব্রেভিস নামে এক ধরনের আলজি আছে- যেগুলো এক মিলিমিটারের ১০০ ভাগের এক ভাগের চেয়ে ছোট। এগুলোও বিষাক্ত ও আক্রমণকারী আলজি যারা নার্ভ গ্যাস নিঃসরণ করে।

এক লিটার পানিতে বিজ্ঞানীরা কয়েক মিলিয়ন আলজির অস্তিত্ব পেয়েছেন। এই করোনিয়া ফোটার পর সপ্তাহ, মাস বা প্রকারভেদে বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। সমুদ্র, হ্রদ ও নদীতে আজ পর্যন্ত ৬০ ধরনের বিষাক্ত আলজি খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস কোটি কোটি রকমের। এগুলোকে ধ্বংস করা মানুষের আয়ত্তের ভেতর নেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব আলজি হাজার-লাখ বছর আগেও জন্ম নিতে পারে বা নিয়েছে। আলজির কারণে প্লেগ বা মহামারী যেকোনো সময় হতে পারে। মিসরের নীল নদেও এমনি এক ভয়াবহ বিপর্যয় হয়েছিল। প্রথম বিবলিকাল প্লেগ সাত দিন পর শেষ হয়। মিসরীয়রা নীল নদের হেপি দেবীর পূঁজা করত, যাতে নীল নদ তাদের রক্ষা করে। আলেকজান্দ্রিয়ায় সমুদ্র উপকূলে হেপির মূর্তি খুঁজে পাওয়া যায়। আলেকজান্দ্রিয়ার জাদুঘরে এসব রক্ষিত আছে। বিষাক্ত লাল রক্ত পানি প্রমাণ করল নীল নদের দেবীর কোনো ক্ষমতা নেই। সবচেয়ে বড় কথা, ফেরাউন যে ক্ষমতাহীন সেটিও প্রথম এই প্লেগের মাধ্যমে মানুষ বুঝতে সক্ষম হয়। এর মাধ্যমে মূসা আ:-এর যে বার্তা- আল্লাহই শক্তিশালী সেটিরও প্রমাণ হয়ে যায়।

তিন হাজার বছর আগে যে মহামারী মিসরে দেখা দিয়েছিল, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মিসরের কিবতিরা। মূসা আ:-এর অনুসারীরা ঘরের ভেতর অবস্থান বা ‘লকডাউন’ করে অবস্থান করত। এটি আল্লাহপাকের নির্দেশ ছিল। সেই কিবতিরা এখনো মিসরে রয়েছে। তাদের অনেকে হতদরিদ্র ও কোথাও কোথাও উপজাতি মর্যাদা পেয়ে থাকে। মাছ ধরা, পশুপালন, মৃতশিল্প এসব এখন তাদের পেশা।

আজ নতুন করে করোনাভাইরাস আরেক বিশ্ব মহামারীর রূপ নিয়ে মিসরে আক্রমণ চালিয়েছে। বিশ্বে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লেও মিসরের সরকার প্রথম দিকে করোনাজনিত মৃত্যু অস্বীকার করে এবং মিসরে কোনো সংক্রমণ হয়নি, এসব নিউমোনিয়াজনিত মৃত্যু বলে প্রচার করে। যারা স্কুল-কলেজ বন্ধ ও কারফিউ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল সরকার, এসব প্রচার তাদের কারসাজি এবং এর পেছনে আইএস জড়িত বলে প্রচার করে। জানুয়ারিতে যখন করোনা প্রথম আঘাত করে তখন আইএসের মুখপত্র নাবাতে, কুরআন শরিফের সূরা আন নাবার নামানুসারে তাদের পত্রিকার এই নাম রাখা হয়েছে, প্রকাশ করা হয়- এই ভাইরাস মানুষের অসৎ কাজের প্রতিফল হিসেবে পাঠানো হয়েছে। ‘জাহিল সমাজে সৃষ্টিকর্তার রোষানল’ বলেও পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়। এই দল মহামারী থেকে বাঁচার জন্য অনুশোচনা বা তাওবা করার এবং আইএসে যোগদান করার আহ্বান জানায়।

সারা বিশ্ব যখন বিমানবন্দর ও পর্যটন বন্ধ করে দিয়েছে, তখন আয়ের পথ রুদ্ধ হওয়ার ভয়ে মিসর তা করেনি। ফলে ইতালির এক পর্যটক লুক্সরে যে জাহাজে নীল নদে ভ্রমণ করছিলেন, তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় একাই জাহাজে থাকা ৪০ জনকে সংক্রমিত করেন। এই সংবাদটি গার্ডিয়ানে প্রকাশ হলে সিসি সরকারের মাথা গুলে যায়।

সরকার পত্রিকার স্থানীয় অফিস বন্ধ করে দেয় এবং সংবাদদাতাকে মিসর থেকে বহিষ্কার করে। তা ছাড়া মিসর চীনের এক পর্যটন দলকেও পর্যটনের দরজা খুলে দেয়, তারাও দেশে ভাইরাস ছড়ায়। সরকারি বিভিন্ন প্রচারপত্রে বলা হয়েছিল ‘আমরা আক্রান্ত হবো না। আমরা মিসরীয়।’ সাধারণ মানুষকে ভয় না পাওয়ার জন্য এমন সব বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়। কিছু মিডিয়ার লোক জড়াজড়ি করে পোজ দেয়া ছবিও পোস্ট করে, ভাবখানা এমন- ‘আমরা করোনাভাইরাসের চেয়েও শক্তিশালী’। এটা তো ফেরাউনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আসেনি যে ধর্ম, জাতীয়তা ভেদে আক্রমণ করবে। এই ভাইরাস পুরুষ ও মহিলাকে বোঝে না, ধনী এবং দরিদ্রকেও। তাই এবার মিসরীয়দের বা কিবতিদের জন্য কোনো সুসংবাদ নেই। যদি মিসরে ব্যাপকভাবে হানা দেয় তবে মৃত্যু সংখ্যা হু হু করে বেড়ে যাবে। কেননা, মিসরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নাজুক। তা ছাড়া স্বাস্থ্য অব্যবস্থা ও সুচিকিৎসার অভাবে এ দেশে কিডনি বিকল, লিভারজনিত ব্যাধি ও ক্যান্সারের রোগী বেশি। এরা আক্রান্ত হলে জীবন রক্ষা সম্ভব নাও হতে পারে।

মিসর এমন ভান করলেও করোনার আঘাতে দুইজন সেনাবাহিনীর জেনারেল মৃত্যুবরণ করেন। তখন সরকার মুহূর্তেই মত পাল্টায় এবং মিডিয়া বাস্তবে ফিরে আসে। স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেয়। জনসমাবেশে নিষেধাজ্ঞা আসে এমনকি রমজানের তারাবিহর নামাজও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সিনেমা, ক্লাব, খেলাধুলা এসবও বন্ধ করে দেয়া হয়। সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ দেয়া হয়। ঘরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। হঠাৎ করে এই পদক্ষেপে লোকজন অত্যাবশ্যকীয় পণ্য কেনা শুরু করে এবং বাজারদর লাফিয়ে উঠে। কেউ গুজব ছড়ালে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

পেছনে তাকালে দেখা যাবে, বার্ড ফ্লু ও সোয়াইন ফ্লুর সময় দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণেও অনেক মানুষ মারা পড়ে। জনসাধারণ হাসপাতালে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্য সহকারীদের অবহেলার অভিযোগ তুলছেন সবখানে। করোনাভাইরাস ঠেকানোর মতো কোনো প্রস্তুতি হাসপাতালগুলোতে নেই। হাসপাতালে মেডিক্যাল সাপ্লাই অপ্রতুল ও টেস্টিং কিট পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ বাজারে কিটের প্রচুর দাম। সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব বেশি। এতে ডাক্তাররাও কাজে অনীহা প্রকাশ করেছেন। জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের ১৫ সদস্য করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এখন ক্যান্সার চিকিৎসাও এক প্রকার বন্ধ।

করোনার ব্যাপকতা নিবারণে সেনাবাহিনী বিশেষ দায়িত্ব নিয়েছে। এটি প্রশংসনীয়। সেনাবাহিনী নিজস্ব কারখানায় বহুল ব্যবহৃত মেডিক্যাল মাস্ক উৎপাদন ও সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রি করছে। সেনাবাহিনী বড় বড় সার্ভিস ভেহিক্যালের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে মোবাইল স্টোরের আদলে এসব ১২ মিসরীয় পাউন্ডে (এক মিসরি পাউন্ড=৫.৩৫ টাকা) বিক্রি করছে, অথচ দোকানে এগোলো ৭০ মিসরীয় পাউন্ডে বিক্রি হচ্ছিল। সেনাবাহিনী বিভিন্ন স্থানে খাদ্যগুদামও গড়ে তুলছে। এসব একটি গুদামের খাবার ৩০ দিন পর্যন্ত ২০ হাজার লোককে খাদ্য সরবরাহ করতে পারবে। মিসরে গত মার্চ মাসে ফরেন রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৪৫.৫ বিলিয়ন। করোনাভাইরাসের আক্রমণে অর্থনীতিতে বড় আঘাত এখনই শুরু হয়েছে। মিসরের দিকে দৃষ্টিপাত দিলে দেখা যাবে, মিসরের জনগণ অনেক কষ্ট-যন্ত্রণা পেয়েছে, শুধু রোগ-বালাই থেকে নয়, তাদের শাসকদের কাছ থেকেও।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার

Comments

comments