রানা প্লাজা ধসের ৭ বছর: মামলার জট খুলবে কবে?

সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৬ জনের মৃত্যুর ঘটনার ৭ বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামীকাল শুক্রবার। বাংলাদেশের ইতিহাসের এই নৃশংস মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলার বিচার মোটেও এগোয়নি। মামলার দুজন অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির পক্ষে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় বর্তমানে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।

কবে নাগাদ মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম শুরু হবে, এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ জানাতে পারেননি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান আইন কর্মকর্তা সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) খোন্দকার আবদুল মান্নান। আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের ঘটনার হত্যা মামলায় দুজন আসামির পক্ষে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ বহাল থাকার কারণে সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে। আমরা আশা করছি, চলতি বছরের মধ্যে ওই দুই আসামির পক্ষে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হবে এবং মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম শুরু হবে।’

পিপি আবদুল মান্নান জানান, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের ব্যাপারে তাঁদের (পিপি) পক্ষে কিছু করার থাকে না। বরং অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তারা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেবেন।

দুজন আসামির পক্ষে স্থগিতাদেশ থাকায় রানা প্লাজা ধসের হত্যা মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ থাকার বিষয়টি জানানোর পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট খোলার পরপরই রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় করা হত্যার মামলায় দুই আসামির পক্ষে থাকা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবেন।

অবশ্য রানা প্লাজা ধসের ঘটনার সাত বছরের মাথায় বিচার শেষ না হওয়ার পেছনে রাষ্ট্রপক্ষের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৬ জন মারা গেলেন। ঘটনার সাত বছর পূর্ণ হচ্ছে। অথচ আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার মোটেও এগোয়নি। কয়েক বছর ধরে একই কথা শুনে আসছি। স্থগিতাদেশে সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ। আমরা মনে করি, রাষ্ট্রপক্ষের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। যে কারণে এই মামলার বিচার এগোচ্ছে না।’

সাত বছর আগে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে নিহত হন ১ হাজার ১৩৬ জন। গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন আরও ১ হাজার ১৬৯ জন। এ ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে অবহেলাজনিত মৃত্যু চিহ্নিত হত্যা মামলাটি করে পুলিশ। ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের অভিযোগে অপর মামলাটি করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। আর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ভবন নির্মাণসংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে আরেকটি মামলা করে।

প্রায় চার বছর আগে ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই হত্যার অভিযোগে রানা প্লাজার মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।

ঢাকা জেলার পিপির দপ্তর সূত্র বলছে, বিচারিক আদালতের অভিযোগ গঠনের আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আট আসামি হাইকোর্টে আবেদন করেন।

শুনানি নিয়ে এই আটজনের পক্ষে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ আসে। ইতিমধ্যে ছয় আসামির স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। কেবল সাভার পৌরসভার তৎকালীন মেয়র রেফায়েত উল্লাহ এবং তৎকালীন কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী খানের পক্ষে স্থগিতাদেশ বহাল আছে।

রানা প্লাজা ধসের জন্য ছয়জন সরকারি কর্মকর্তাকে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি করার অনুমতি না পাওয়ার কারণে তিন বছর ঝুলে ছিল এই মামলা। সে সময় জনপ্রশাসন ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের যুক্তি ছিল, যাঁরা বড় অপরাধ করেননি, তাঁদের অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি করার অনুমতি দিতে পারবে না তারা। শেষ পর্যন্ত সরকারের অনুমোদন না পাওয়া গেলেও তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

আদালত সূত্র বলছে, রানা প্লাজা ধস হত্যা মামলায় ৪১ আসামির মধ্যে বর্তমানে কারাগারে আছেন একজন। তিনি হলেন রানা প্লাজা ভবনের মালিক সোহেল রানা। জামিনে আছেন ৩২ আসামি। পলাতক ছয়জন। মারা গেছেন দুই আসামি।

হত্যা মামলার অভিযোগপত্র কী বলছে

রানা প্লাজা ধস হত্যা মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে সাভার থানার পুলিশ। এরপর তদন্ত করে ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। সবশেষ পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে নয়টায় সাভারের রানা প্লাজা ভবনের তৃতীয় তলায় পিলার ও দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। খবর পেয়ে বিজিএমইএর কর্মকর্তারা রানা প্লাজা ভবনে আসেন। গার্মেন্টস মালিকদের পরামর্শ দেন, বুয়েটের ভবন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা পর্যন্ত সব কার্যক্রম যেন বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু পাঁচ গার্মেন্টস মালিক এবং তাঁদের লোকজন ভয়ভীতি দেখিয়ে পরদিন (২৪ এপ্রিল) শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেন। এর সঙ্গে যোগ দেন রানা প্লাজা ভবনের মালিক খালেক ও  যুবলীগ নেতা সোহেল রানা। সোহেল রানা সেদিন বলেছিলেন, ‘আগামী ১০০ বছরেও রানা প্লাজা ভেঙে পড়বে না।’

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, রানা প্লাজা ভবন তৈরির প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়ম ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিলেন ভবনটির মালিক খালেক এবং তাঁর ছেলে সোহেল রানা, যা রানা প্লাজা ভবনকে একটি মৃত্যুকূপে পরিণত করে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, বাণিজ্যিক এই ভবনে পাঁচটি পোশাক কারখানা ছিল। এসব কারখানায় বসানো হয় বৈদ্যুতিক ভারী জেনারেটর, ভারী সুইং মেশিন। রানা প্লাজা ধসের আগের দিন ভবনের তৃতীয় তলায় ফাটল দেখা দেয়। কিন্তু মালিকপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা না করে পরদিন পাঁচটি পোশাক কারখানা চালু করে। ঘটনার দিন সকাল নয়টায় রানা প্লাজায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন একসঙ্গে পোশাক কারখানাগুলো তিনটি জেনারেটর চালু করে। ঠিক তখনই রানা প্লাজা ভবন বিকট শব্দ করে ধসে পড়ে।

এ ছাড়া ইমারত নির্মাণ আইনে মামলায় রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ওই অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিম (সিজিএম) আদালত পরের বছর ১৪ জুন অভিযোগ গঠন করেন। ওই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন আসামি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন।

পিপি খন্দকার আবদুল মান্নান জানান, রিভিশনের কারণে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ স্থগিত রয়েছে।

কেবল রানা প্লাজার ভবন নির্মাণসংক্রান্ত দুর্নীতির মামলার বিচার চলমান। মামলাটি ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ চলমান।

রানা প্লাজা ধসের ঘটনার মামলাগুলোর বিচারের দীর্ঘসূত্রতার বিষয় জানানো হলে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। যেকোনো মামলার বিচার বিলম্বিত হলে বিচারপ্রার্থী চরম হতাশ হন। রানা প্লাজা ধসের মতো আলোচিত ঘটনার মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষকে আরও তৎপর হওয়া উচিত।

Comments

comments