হিজাব নিষিদ্ধের দেশ গুলোতে হিজাব এখন বাধ্যতামূলক

করোনায় হিজাবি নারীদের জীবনে স্বস্তি এনেছে

করোনা প্রাদুর্ভাবের আগে পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনে হিজাবি নারীরা নানা বৈষম্যের শিকার হতো। আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুরু করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নৃশংস হামলার শিকার হতে হয়েছে মুসলিম নারীদের।

কিন্তু করোনার সংক্রমণ শুরুর পর থেকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। এখন পশ্চিমা বিশ্বে হিজাব পরিধানের কারণে বৈরী দৃষ্টিভঙ্গির সম্মুখীন হতে হচ্ছে না মুসলিম নারীদের। বরং মুখ ঢেকে রাখাই এখন যেন অপরিহার্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ধর্ম ও যৌন বিভাগের আনাবেলা নামক একজন গবেষক মুসলিম হিজাবি নারীদের ওপর গবেষণা করেন।

তিনি বলেন, আমেরিকানরা করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর মাত্র চেহারা ঢাকা শুরু করেছে। সেখানকার স্থানীয় ও ফেডারেল নেতারা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। কেননা হিজাব করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে। ফলে হিজাবি নারীদের জীবনে নেমে এসেছে স্বস্তির বাতাস।

আনাবেলা আরও বলেন, আমার একটি বইয়ের জন্য আমি ৩৮ জন আমেরিকান ও ব্রিটেনের মুসলিম হিজাবি নারীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। যাদের অধিকাংশই আমেরিকা অথবা ব্রিটেনের অধিবাসী।

যদিও তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও বিভিন্ন ধর্ম থেকে আগমন করেছে। কেউ আগে ছিলেন ইহুদি, কেউ খ্রিস্টান, আবার কেউ নাস্তিকও ছিলেন।

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হিজাব নারীদের আল্লাহর নৈকট্যশীল বানায়। ইসলামের অনুশাসন মেনে চলতে সহযোগিতা করে। কিন্তু তারা হিজাব পরার কারণে ইসলামবিরোধী ও বর্ণবাদীদের রোষানলে পড়েছেন বারবার।

২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৪০ হিজাবি নারীর ওপর গবেষণা করে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। যাতে বলা হয়েছে– ৮৬ শতাংশ নারী মৌখিক নিপীড়ন ও ২৫ শতাংশ নারী শারীরিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন শুধু হিজাবের জন্য।

মানবাধিকার গ্রুপ ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন ২০১৪ সালে পরিচালিত এক জরিপের ওপর ভিত্তি করে বলেছে, ব্রিটেনের ৮০ শতাংশ নারী হিজাবের জন্য শারীরিক ও মৌখিক নির্যাতনের শিকার।

এখন পরিস্থিতি পুরো পাল্টে গেছে। করোনাভাইরাসের কারণে সেখানকার হিজাবি নারীদের জীবনযাপন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আফরাহ নামের এক নারী বলেন, হিজাব, মোজা বোরকার কারণে আমাকে এতদিন সবাই হেয় নজরে দেখত। কিন্তু পরিস্থিতি হঠাৎ পাল্টে গেছে।

ফ্রান্স থেকে জামিলা নামে আরেক নারী লিখেছেন– সরকারিভাবে এখানে হিজাব নিষিদ্ধ ছিল। আমি এখন নিজের হাতে তৈরি হিজাব পরছি। কেউ আমার দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকায় না।

হিজাব নিষিদ্ধের দেশে এবার মুখ না ঢাকলেই জরিমানা

এছাড়া ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে আইন করে মুসলিম নারীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করা হলেও করোনা সংক্রমিত হওয়ার পর দেশটির নাগরিকরা এখন মুখ ঢেকে চলাফেরা করতে বাধ্য হচ্ছেন!

এমনকি হিজাব না পরে বা মুখ না ঢেকে চলাফেরা করলে ১৫০ ইউরো জরিমানার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

করোনায় আক্রান্ত শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটিতে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ৪ হাজার ৪৬৯ জন। এর মধ্যে মারা গেছে ৯১ জন।

সম্প্রতি ফ্রান্সের বিখ্যাত ‘প্যারিস ফ্যাশন সপ্তাহ’- এ মডেলরা মুখোশ পরেই অংশগ্রহণ করেন। মডেলদের পরিহিত মুখোশগুলো দেখতে অনেকটাই হিজাবের মতোই ছিল।

শুধু ফ্রান্সেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় নারী মডেল থেকে শুরু করে সবাই মুখোশ পরছেন। নিরাপত্তার বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখেই তারা এ মুখোশ পড়ছেন।

প্যারিসের ওই ফ্যাশন সপ্তাহ নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিবিসি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

ওই প্রতিবেদনটি টুইটারে শেয়ার করেন নামিরা ইসলাম নামের এক নারী। টুইটার হ্যান্ডেলে ওই নারী নিজেকে বাঙালি মুসলিম আইনজীবী ও গ্রাফিক ডিজাইনার বলে উল্লেখ করেছেন।

নামিরা ইসলাম বলেন, এবং যেখানে আমাকে বলা হয়েছিল, উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপরাধ ও নিরাপত্তা হুমকির জন্য তোমার মুখ ঢেকে (পর্দা) রাখ।’

ফ্রান্সের হিজাব নিষিদ্ধের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে টুইটবার্তার কমেন্টবক্সে তিনি আরও লেখেন- ফ্রান্স হলো সেই দেশ যারা মুখের ওড়নার (হিজাব) ওপর প্রথম নিষেধাজ্ঞার প্রবর্তন করেছিল।

নামিরা ইসলাম জানান, ‘প্রকাশ্য স্থানে মুখ গোপন করা’ হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণ হিসেবে ‍উল্লেখ করেছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্লড গুয়ান্ট।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালে ফ্রান্স যখন প্রথম ‘মুখ ঢাকা পোষাক’ নিষিদ্ধ করে তখন তা ইউরোপে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে। ইউরোপে ফ্রান্সই ছিল প্রথম দেশ যারা এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়।

ফ্রান্সে কেবল বোরকা নয়, মুখ ঢাকা যে কোনো পোশাক, মুখোশ, বালাক্লাভা, হেলমেট বা হুড – যা পরিচয় গোপন রাখতে সহায়তা করে, তা নিষিদ্ধ।

২০১৯ সালের ১৬ মে ফ্রান্সের সংসদ অধিবেশনে স্কুল শিক্ষার্থীদের হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

Comments

comments