মে দিবস আজ, সেই শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত

আজ পহেলা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও দাবি আদায়ের দিন। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের উপযুক্ত মজুরি আর দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে ওই শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা। কিন্তু আন্দোলনরত শ্রমিকদের দমাতে মিছিলে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় পুলিশ। এতে ১১ শ্রমিক নিহত হন। আহত ও গ্রেফতার হন আরও বহু শ্রমিক। পরে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে গ্রেফতারকৃত শ্রমিকদের মধ্যে ছয়জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এতে বিক্ষোভ আরও প্রকট আকার ধারণ করে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে। পরবর্তীতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার।

১৮৮৯ সালের ১৪ই জুলাই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরের বছর ১৮৯০ সাল থেকে পহেলা মে-কে বিশ্বব্যাপী ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন হয়ে আসছে।

কিন্তু আজ এই প্রাণঘাতী করোনায় সেই শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। একদিকে প্রাণঘাতী করোনার ছোবল অন্যদিকে ক্ষমতাসীন সরকারের পাশাপাশি মালিক পক্ষের জুলুম যেন থামছেই না।

ক্ষমতাসীনদের অব্যবস্থাপনার বলি শ্রমিকরা

বাংলাদেশে করোনায় প্রথম ছোবলের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ৭ দিন পর যখন দেশের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে ঠিক তখন কারখানা খুলে দেয় মালিকপক্ষ। পরে শ্রমিকদের আন্দোলনের দাবিতে আবারও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কয়েক দিন পার হতে না হতেই ক্ষমতাসীনদের নির্দেশে আবারও কারখানা খোলার হিড়িক পড়ে যায়। শ্রমিকরা তাদের বেতনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ক্ষমতাসীন সরকার প্রণোদনার নামে প্রতারণা শুরু করে শ্রমিকদের সাথে। সুদের বিনিময়ে প্রণোদনার সিদ্ধান্ত শ্রমিকরা অসহায় হয়ে পড়ে।

মালিক পক্ষের কাছে জিম্মি হয়ে জীবনের ঝুকি নিয়ে আবারও কাজ শুরু করে শ্রমিকরা। দেখা যায়, করোনা থেকে বাঁচতে যখন সামাজিক দূরত্ব নিশ্চত থাকার কথা ঠিক তখন রাজপথে বেতনের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছে শ্রমিকরা।

দেখা গেছে, করোনা ভাইরাসের সংক্রামণে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত নারায়ণগঞ্জে নতুন করে আরও ২৩টি তৈরি পোশাক কারখানায় সীমিত পরিসরে কাজ শুরু হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত জেলায় ১২৬টি কারখানা খোলা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে পোশাক কারখানাগুলো খোলার পর দিনই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে এক লাফে চলে গেছে ৮৪ জনে। যা নারায়ণগঞ্জের জন্য সর্বোচ্চ রেকর্ড। এনিয়ে এখন জেলা জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামে চালু হয়েছে ৬০ গার্মেন্টস কারখানা। সেখানে নেই শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা।

এরপর, পিরোজপুরের এক ব্যক্তির করোনার রিপোর্ট পজেটিভ আসার পরও তিনি চাকরি বাঁচাতে আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় যোগ দিয়েছেন। এ সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশের পর ওই কারখানার অন্য শ্রমিকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়া বলেছেন, আমরা এখনো লকডাউন যথাযথভাবে প্রয়োগ এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে মানুষজনকে বাধ্য করতে পারিনি। মানুষ এখনো এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে, আমরা যদি কারখানাগুলো আবার চালু করি, আমাদের চরম মূল্য দিতে হবে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর করোনাভাইরাসের হটস্পট (সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত এলাকা), যেখানে বেশিরভাগ কারখানা অবস্থিত। আমরা যদি এসব এলাকার শ্রমিকদের কারখানায় কাজ করার অনুমতি দেই, তবে ভাইরাসটি ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়বে। করোনা আক্রান্ত কর্মীর মাধ্যমে অন্য সব সহকর্মীদের মধ্যে ভাইরাসটি সংক্রমিত হতে পারে।

অপরদিকে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও এ অবস্থায় শ্রমিকদেরকে কাজে লাগানোর বিষয়ে আপত্তি তুলেছেন। তারা বলছেন, পরিবেশ ভাল না হলে শ্রমিকরা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, পোশাক কারাখানাগুলো খুলে দিয়ে সরকার আত্মঘাতী কাজ করেছে। শেখ হাসিনা তার কথিত উন্নয়ন ধরে রাখতে ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে সস্তা বাহ বাহ অর্জনের জন্য তিনি হাজার হাজার পোশাক শ্রমিককে মৃুত্যর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। হাজার হাজার পোশাক শ্রমিকের মাধ্যমে এই ভাইরাস এখন সারাদেশ ছড়িয়ে পড়বে। তারা বলছেন, সরকার যদি এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এসে তাহলে কিছু দিনের মধ্যেই করোনায় সারাদেশ মৃত্যুকুপে পরিণত হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিশ্বের ৩৩০ কোটি শ্রমিক

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাস ছিল ২০২০-২১ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক সংকট, ইউরোপে ব্রেক্সিটসহ নানা কারণে অর্থনীতির শ্লোথগতিতে এমন পূর্ভাবাস দিয়েছে সংস্থাগুলো।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চলমান করোনাভাইরাসের মহামারী। যা পুরো বিশ্বকে স্থবির করে দেয়। এটি মোকাবেলায় প্রস্তুতি ছিল না কোনো দেশেরই। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে শ্রমিকরা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, করোনার আঘাতে বিশ্বে ৩৩০ কোটি শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের শ্রমঘন শিল্পে বেকারত্ব মারাত্মক আকার ধারণ করবে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার হিসাবে দেশে সাড়ে ৪ কোটি মানুষ বেকার।

আর এই মুহূর্তে করোনা থেমে গেলেও নতুন করে বেকারত্বের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও ২ কোটি মানুষ। শুধু দেশেই নয়, কাজ হারানো ঝুঁকিতে দেশের অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ শক্তি প্রবাসীরা। প্রবাসে থাকা ১ কোটি শ্রমিকের উল্লেখযোগ্য অংশই বেকার হয়ে পড়বে- এমন আশঙ্কা বিভিন্ন সংস্থার।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। আর ‘লকডাউন’ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি হবে আরও ভয়াবহ। পরিস্থিতি মোকাবেলায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। সব পক্ষই সরকারের কাছে প্রণোদনা চাচ্ছে।

জানা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশিই শ্রমিক। প্রতি বছর ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে আসছে। এই শ্রমিকের ওপর ভিত্তি করেই শক্তিশালী হচ্ছে অর্থনীতি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অর্থনীতির আকার বড় হলেও আয়ে বৈষম্যও ছিল ব্যাপক।

এ অবস্থায় করোনা-উত্তর দেশে বিনিয়োগে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। না হলে জনশক্তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অর্থনীতির যে হিসাব ছিল, করোনা সবকিছুই পাল্টে দিয়েছে। শ্রমিকদের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। তার মতে, দেশের অর্থনীতির মূল শক্তি হল বেশির ভাগ মানুষ কর্মক্ষম। এদের মজুরিও প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কম।

তবে সামগ্রিকভাবে বিচার করলে শ্রমিকদের দক্ষতার অভাব রয়েছে। জনশক্তি এখনও সম্পদে পরিণত হয়নি। ফলে শ্রমিকদের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগানো যায়নি। তিনি বলেন, দেশে শিক্ষার হার বাড়ছে। কিন্তু শিক্ষার মান বাড়ছে না। এ কারণে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই বেশি। এ অবস্থার উত্তরণে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।

পাশাপাশি বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে এই জনশক্তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। বিষয়টি বিবেচনা করে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শ্রম আইন ২০০৬ সালের ২(৬৫) ধারায় বলা হয়েছে, শ্রমিক হল ওই ব্যক্তি, যিনি তার চাকরির শর্ত পালন করে কোনো প্রতিষ্ঠানে বা শিল্পে সরাসরিভাবে বা কোনো ঠিকাদারের মাধ্যমে মজুরি বা অর্থের বিনিময়ে দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরি, ব্যবসা উন্নয়নমূলক অথবা কেরানিগিরির কাজে নিযুক্ত।

চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ২৮ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সেবা খাতের অবদান ৫৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ, শিল্পের ৩১ দশমিক ১৫ এবং কৃষি খাতের ১৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। আবার জিডিপির সঙ্গে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ (রেমিট্যান্স) যোগ করলে হয় জাতীয় আয়। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলার।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে যা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের পর্যায়ে পড়ে। অর্থনীতির এই অর্জনের পেছনে শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। দেশের শ্রমশক্তিতে যোগ হচ্ছে নতুন কর্মশক্তি। তৈরি পোশাক, কৃষি, শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে প্রতিদিনই নতুন শ্রমশক্তি আসছে। এরাই তাদের মেধা ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

Comments

comments