শহীদ মাওলানা নিজামী একটি নাম একটি ইতিহাস

মো. তোফাজ্জল বিন আমিন

সত্য মিথ্যার দ্বন্দ্ব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে অদ্যবধি বিদ্যমান। যেখানে সত্য তার আলো প্রসারিত করেছে, সেখানেই ঝড়ের বেগে অন্ধকার এসে ঝাপটা দিয়ে সত্যের আলোকে নিভিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু সত্যের বীর সেনানীরা জীবন বাজি রেখে কালেমার দাওয়াত মানুষের নিকট পৌঁছে দিয়েছে। সত্যের পতাকা হাতে নিয়ে যখন ইব্রাহিম (আ.) এগিয়ে এলেন ঠিক তখনই নমরুদ বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। হজরত মুসা (আ.) যখন কালেমার দাওয়াত জাতির সামনে পেশ করছেন ঠিক সে সময়ে ফেরাউন বাধার পাহাড় তৈরি করলো। হজরত মুহাম্মদ (সা.) যখন এক আল্লাহর দাওয়াত জাতির সামনে পেশ করছেন ঠিক তখনই আবু জেহেল ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতে দ্বীনের কাজে বাধা দেয়া শুরু করেছে।

যুগ যুগ ধরে আবু জেহেল আবু লাহাবের প্রেতা-ত্মারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সত্যের আলোকে দুনিয়া থেকে চিরতরে নিভিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু দুনিয়া ও আরশের মহান অধিপতি তাদের সকল ষড়যন্ত্রকে নস্যাত করে যুগে যুগে পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে ইসলামের কাণ্ডারি প্রেরণ করেছেন। অন্যায় অসত্যের বিরুদ্ধে ইসলামের দা’য়ীরা জীবনবাজি রেখে দাঁড়িয়েছিল বলেই তো আজোও দেশে দেশে আল্লাহ পাকের প্রশংসার আওয়াজ কান পাতলেই শোনা যায়। খোলাফায়ে রাশেদীনের পর মুসলিম ইতিহাসের আদর্শবাদী ধারা যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়লেও পরবর্তী প্রত্যেকটি যুগে এমন কিছু বিরল ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে যাঁরা সত্য ও ন্যায়ের পথে লড়াই করে কালেমার দাওয়াত জাতির সামনে পেশ করেছেন, তাদেরই একজন দা’য়ী শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। আল্লাহর হুকুম ব্যতীত কারো মৃত্যু হয় না। আল্লাহ যখন যেভাবে চান সেভাবেই প্রত্যেকটি মানুষের মৃত্যুর ফায়সালা হয়। শহীদ নিজামীর বেলায় ও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। নবুওয়াতের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে বহু আগে কিন্তু শাহাদাতের দরজা কিয়ামত পর্যন্ত খোলা থাকবে সৌভাগ্যবানদের জন্যে।

যদি হত্যা বা নির্যাতনের মাধ্যমে ইসলামকে থামিয়ে দেয়া যেত তাহলে ওমর, ওসমান, আলী, খাব্বাব, হুসাইন, হাসান আল বান্না, সাইয়েদ কতুবদের মৃত্যুর পর ইসলাম ওখানেই থেমে যেত। প্রকৃত কথা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোসহীনতা ও আত্মত্যাগের উপরেই ইসলামের ভিত্তি রচিত। শহীদ নিজামীর মৃত্যুর সংবাদ শুধু বাংলাদেশ নয়, দুনিয়াব্যাপী ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীদের কাঁদিয়েছে। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে তার গায়েবানা জানাজায়। শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে হাজারো জনতা তাঁর গ্রামের বাড়িতে জানাজায় অংশগ্রহণ করেছে। তাঁর মৃত্যুর পর এটা প্রমাণিত হয়েছে যে জীবিত নিজামীর চেয়ে শহীদ নিজামী লক্ষ কোটি গুণে বেশি শক্তিশালী। তিনি ছিলেন ইসলামের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েম করার জন্যে। তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো লিখলে একটি বই রচনা হয়ে যাবে। তাঁর পুরো জীবনী লেখা আমার উদ্দেশ্য নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলনে তাঁর যে অবদান রয়েছে তা আলোচনা করা মূলত এই লেখার উদ্দেশ্য। ইতিহাসের পাঠ থেকে এই মজলুম নন্দিত জ্ঞানী মানুষের কথা নির্যাতিত ইসলামী আন্দোলনের ভাইবোনদের খেদমতে পেশ করছি।

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী একটি নাম, একটি জীবন্ত ইতিহাস। অবিনাশী শক্তির এক চেতনার নাম। তিনি বিশ্বনন্দিত ইসলামী চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদ। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে শুরু করে বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ইতিহাস হয়ে থাকবে চিরকাল। বাংলাদেশের মাটি আলো-বাতাস এবং মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে আছে তার সুদীর্ঘ জীবন সংগ্রামের ইতিহাস। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রেরণার বাতিঘর হিসেবে তিনি অমর হয়ে থাকবেন। তার চিন্তা চেতনা আর সাহসিকতা আর বলিষ্ঠতা এদেশের ছাত্র যুব সমাজ তথা ইসলাম প্রিয় মানুষের আদর্শ হয়ে থাকবে যুগ থেকে যুগান্তরে। জালেমের জুলুমের শিকার হয়ে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী শহীদী মৃত্যুর পেয়ালা পান করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন এক যোগ্য ও আদর্শ নেতৃত্বের বিরল দৃষ্টান্ত মানুষের সামনে রেখে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের শীর্ষ ও বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম আপোষহীন নেতা। তিনি একদিকে রাজনীতিবীদ অন্যদিকে অধিকার বঞ্চিত মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা ছিলেন। দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত এই মহান ব্যক্তিত্বের সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ থাকবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি অনন্য ও অদ্বিতীয়, যিনি আদর্শের জন্য লড়াই করতে করতে অকাতরে নিজের প্রিয় জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন।

জন্ম ও শিক্ষা জীবন:

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ১৯৪৩ সালের ৩১ মার্চ পাবনা জেলার সাঁথিয়া থানাধীন মনমথপুর গ্রামে এক মুসলিম ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা লুৎফর রহমান খান ছিলেন একজন আল্লাহভীরু সহজ সরল মানুষ। তাঁর পিতার অনুপ্রেরণায় তিনি শিশু বয়সে ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের আলোকে গড়ে ওঠার সুযোগ লাভ করেন। মনমথপুর প্রাইমারি স্কুলে তাঁর লেখাপড়ার সূচনা হয়। প্রাইমারি স্কুলে পড়াশুনা শেষ করে সাঁথিয়ার বোয়াইলমারী মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯৫৭ সালে দাখিল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৯ সালে পাবনার শিবপুর ত্বহা সিনিয়র মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উর্ত্তীণ হন এবং বোর্ডে ষোলতম স্থান অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে একই মাদরাসা থেকে ফাজিল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের জন্য ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯৬৩ সালে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে কামিল পরীক্ষায় ফিকাহ শাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৬৭ সালে ইসলামী স্টাডিজে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। জীবনের সব পরীক্ষায় তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।

ছাত্র আন্দোলনে ভূমিকা:

১৯৬১ সালে ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। ইসলামের এই দায়ী খুব অল্প সময়ে ছাত্র শিক্ষকদের মাঝে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় অধ্যয়নকালে ইসলামী আদর্শের পতাকাবাহী ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত হন। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় অফিস সেক্রেটারির দায়িত্ব অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে পালন করেন। ১৯৬৬ সাল থেকে শুরু করে পরপর তিন বছর পূর্ব পাকিস্তানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি নিখিল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সভাপতি (নাজেমে আলা) নির্বাচিত হন। দুই বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। শহীদ নিজামীর নেতৃত্বে পরিচালিত শিক্ষা-আন্দোলন এদেশের ছাত্ররাজনীতিতে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৬৭-১৯৬৮ সালে ছাত্রদের উদ্যোগে শিক্ষাসমস্যা-শিক্ষাসংকট ও শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন সম্পর্কিত দুটি পুস্তিকা শহীদ নিজামী নেতৃত্ব বের হয়েছিল। শহীদ নিজামী একজন সফল সংগঠন ও বহুগুণের এবং প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। লেখাপড়া ও সাংগঠনিক কার্যক্রম উভয় দিকেই তিনি সাফল্য অর্জন করেন।

জামায়াতে ইসলামীতে দায়িত্ব পালন :

ছাত্রজীবন শেষে শহীদ নিজামী ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। ১৯৭৯-১৯৮২ সাল পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মনোনীত হন এবং ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ওই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৮ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ সাল থেকে শাহাদাতবরণের সময় (১১ মে ২০১৬) পর্যন্ত তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমীরের দায়িত্বে ছিলেন। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ১৯৯১ সালে পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) নির্বাচনী এলাকা থেকে ৫ম জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদে যোগদান করেন। শহীদ মাওলানা নিজামীর নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী আজ দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহত্তম ইসলামী দলে পরিণত হতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর গতিশীল নেতৃত্ব ও শাহাদাতের বিনিময়ে এদেশের বুকে কালেমার দাওয়াত প্রসারিত হবে ইনশাআল্লাহ। এটা হাজারো নেতা কর্মীর প্রত্যাশা।

মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে সততা:

বর্তমান বিশ্বে যেখানে সৎ ন্যায়-নিষ্ঠাবান, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি মুক্ত আদর্শিক যোগ্য ও মেধাবী রাজনৈতিক নেতা খুঁজে পাওয়া ভার সেখানে মাওলানা নিজামীর সততা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। তিনি এশিয়া মহাদেশের একমাত্র স্বর্ণপদক প্রাপ্ত সফল মন্ত্রী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে অবিবেচকরা অনেক অভিযোগ উত্থাপিত করতে পারলেও কোন দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত করতে পারেনি এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল চ্যানেল আইয়ের সাম্প্রতিক বিষয়ের উপর মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠানে বলেন, আপনি জানেন আমি নির্মূল কমিটির আন্দোলন করেছি। আমি গণ আদালতে ২৪ জন আসামির একজন। জামায়াতে ইসলামের বিরুদ্ধে কতবার কতভাবে লিখেছি। এখনো লিখি। বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীই কম বেশি দুর্নীতির সাথে যুক্ত উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, নিজামী কিংবা জামায়াত নেতারা এক্ষেত্রে একেবারেই আলাদা। তাদের বিরুদ্ধে ১/১১’র সরকার পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগ আনেনি। তিনি আরো বলেন, যদি তারা সত্যিই দুর্নীতির সাথে যুক্ত হতেন আওয়ামী লীগ অবশ্যই তাদের ছেড়ে দিত না। নিজামীর বিরুদ্ধে লেখার জন্য অসংখ্য পত্রিকা রয়েছে। কিন্তু কেউই কিছু লিখছে না। এর কারণ একটাই তার বিরুদ্ধে কোন দুর্নীতি কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। তাঁর এই সকল অনুপম গুণ বৈশিষ্ট্যগুলো যুগ যুগ ধরে যে কোন সৎ ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তি আর ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীদের অনুপ্রাণিত করবে।

মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে অবদান : দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে শহীদ নিজামীর দায়িত্বশীল ভূমিকা সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে। তিনি কওমী মাদরাসার স্বীকৃতি ও মান প্রদান এবং ফাজিল কামিলের মান প্রদানের বিষয়ে চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে মাদরাসা শিক্ষার প্রসারের ব্যাপারে তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল। তিনি শিক্ষা সংক্রান্ত মন্ত্রী সভা কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন।

উদারতার এক বিরল দৃষ্টান্ত : শহীদ মতিউর রহমান নিজামী ব্যক্তিগত জীবনে একজন স্বল্পভাষী ও অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী ছিলেন। সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত একজন নরম মনের মানুষ। কারো সাথে রূঢ় আচরণ বা কটুকথা বলে কাউকে কষ্ট দিয়েছেন এমন নজির খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বরং বিরোধীমতের মানুষের বিপদের সময়ও সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছেন। যার বাস্তব নমুনা শহীদ আসাদ। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন চলাকালে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী আসাদ নিহত হন। আদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকা সত্বেও শহীদ নিজামী আসাদের জানাজায় উপস্থিত হন। ছাত্রনেতৃবৃন্দ তাঁকে ইমামতি করার অনুরোধ করলে, তিনি জানাজা নামাজের ইমামতি করেন। এ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন ছাত্রজনতার হৃদয়ের স্পন্দন।

বিশ্ব রাজনীতিতে মাওলানা নিজামী:

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উপমহাদেশের অত্যন্ত সুপ্রাচীন ‘‘বাবরী মসজিদ’ ভেঙ্গে ফেলা হয়। ভারতের বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার প্রতিবাদে বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী জামায়াতের সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে ৫ম জাতীয় সংসদে বাবরী মসজিদের উপর আলোচনার জন্য প্রস্তাব পেশ করেন। ফারাক্কা বাংলাদেশের জনগণের জীবন মরণ সমস্যা। ফারাক্কা ইস্যু নিয়েও শহীদ নিজামী জাতীয় সংসদে আলোচনার জন্য স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বসনিয়া-হারজেগোভিনা পরিস্থিতির বিষয়ে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী জাতীয় সংসদে নোটিশ দেন। ২০০২ সালের ২৭ মার্চ মুসলিম দুনিয়ার অন্যতম স্কলার ডক্টর ইউসুফ আল কারযাভীর নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যের দশজন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা নিজামীর সাথে সাক্ষ্যাৎ করেন। ২০০২ সালের ১১ এপ্রিল রাবেতা আল আলম আল ইসলামীর সম্মেলনে যোগদান করেন এবং সৌদি গেজেট পত্রিকায় সাক্ষ্যাৎকার প্রদান করেন। তিনি ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের ৫২ জন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীকে আহ্বান জানান। ২০০৩ সালের ১৫-১৭ অক্টোবর চীনে অনুষ্ঠিত (Sustained Elimination of Iodine Deficiency Disorder) শীর্ষক সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মতিউর রহমান নিজামী। ২০০৬ সালে সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত রাবেতা আল আলম আল ইসলামী কর্তৃক আয়োজিত আন্তর্জাতিক ওলামা সম্মেলনে তিনি আমন্ত্রিত হয়ে যোগদান করেন। মুসলিম উম্মায় তার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০০৯ সালের ইউএসএ ভিত্তিক‘‘ দ্যা রয়েল ইসলামিক স্ট্যাটিজিক স্টাডিজ সেন্টার কর্তৃক বিশ্বের শীর্ষ ৫০ ব্যক্তিত্বের মধ্যে মাওলানা নিজামীকে নির্বাচন করেন ওই সংগঠন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ সরকারের সাবেক মন্ত্রী হিসেবে বিশ্ব রাজনীতির নানান গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইস্যুতে তাঁর ভূমিকা সর্বমহলে প্রসংশিত হয়েছে।

বিদেশ সফর:

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের আমন্ত্রণে সফর করেন। তিনি ব্রিটেন, আমেরিকা, ফ্রান্স, গ্রীস, জার্মানি, চীন, ইতালি, কানাডা, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, কুয়েত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, জাপান, ইরান, তুরস্ক সফর করেন। এর মধ্যে ১৯৮০, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০০, ২০০১, এবং ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবারই রয়েল গেস্ট হিসেবে সৌদি আরব সফর করেন। ইসলামের এই দা’য়ী সারাটা জীবন ইসলামের খেদমতের জন্যে দেশবিদেশে সফর করেছেন।

লেখক ও চিন্তাবিদ হিসেবে শহীদ নিজামী:

সাংগঠনিক কাজের শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি লেখা ও চিন্তার জগতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে এত বই লেখা সত্যিই কঠিন। তারপরেও তাঁর লিখিত বইয়ের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হচ্ছে, ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন, গণতন্ত্র গণবিল্পব ও ইসলামী আন্দোলন, কুরআনের আলোকে মুমিনের জীবন, আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়, ইসলামী আন্দোলন, সমস্যা ও সম্ভাবনা, মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব ও কর্তব্য, ইসলাম ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে, কুরআন রমজান তাকওয়া, ইনসাফ ফি সাবিলিল্লাহ, ইসলামী আন্দোলন চ্যালেঞ্জ ও মোকাবেলা, ইসলামী আন্দোলন পথ ও পাথেয়, আল কুরআনের পরিচয়, দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব, ইসলামী সমাজ বিপ্লব, এক পরাশক্তির অন্যায় যুদ্ধ আতংকিত করেছে বিশ্বের মানুষকে, ২০০৩-২০০৪ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের উপর মাওলানার ভাষণ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পর্কে ওলামা কেরামকে সচেতন থাকতে হবে, জাতীয় সংসদে বক্তৃতামালা ইত্যাদি। বিশেষ করে জেলে বসে তিনি আরো দুটি বই লেখেছেন- কুরআন হাদীসের আলোকে রাসূল মুহাম্মদ (সা.) ও আদাবে জিন্দেগী। পাঠকদের অনুরোধ করব তাঁর লিখিত বইগুলো পড়ার জন্য। তবে ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন বইটিতে তিনি যা লিখেছেন তা খুবই প্রণিধানযোগ্য। তার কিছু অংশ (৩য় অধ্যায়) থেকে পাঠকদের জ্ঞাতার্থে পেশ করছি : ‘‘একটা দেশে পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি নিম্ন লিখিত কয়েকটি রূপেই হতে পারেঃ

এক. দেশ, জাতি ও সমাজ পরিচালনা করার মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে যোগ্য, সৎ, খোদাভীরু লোক তৈরি হওয়ার সাথে সাথে দেশের জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশের বা অধিকাংশের সমর্থন-সহযোগিতার ভিত্তিতে ইসলাম বিজয়ী হবে।

দুই. লোক তৈরি হবে কিন্তু জনগণের উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন পাবে না। এই সমর্থন না পাওয়ার ফলে আন্দোলনকারীদের সামনে তিনটি অবস্থা আসতে পারে। (১) তাদের সবাইকে না হলেও উল্লেখযোগ্য অংশকে শহীদ করা হবে। যেমন হজরত হোসাইন (রা.) ও তার সাথীদের ব্যাপারে ঘটেছে। (২) তারা দেশ থেকে বহিষ্কৃত হবে। অথবা (৩) দেশের মধ্যেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা থাকবে।

প্রথম রূপটিকে তো সবাই সাফল্য হিসেবেই বিবেচনা করবে। কিন্তু এই সাফল্য ঝুঁকিবিহীন নয়, ইসলামী খেলাফতের মর্যাদা রক্ষা করতে পারা না পারার উপরই এর চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করে। দ্বিতীয় রূপটির প্রথমটি অর্থাৎ শাহাদাতবরণ আপাত-দৃষ্টিতে ব্যর্থতা মনে হলেও সবচেয়ে ঝুঁকিবিহীন সাফল্য। সত্যি সত্যি ঈমানের সাথে কেউ এই পথে শাহাদত বরণ করে থাকলে তার চেয়ে বড় ভাগ্যবান আর কেউ নেই। আল্লাহর রাসূলের সুস্পষ্ট ঘোষণা : আল্লাহর হুকুম পালনে মৃত্যুবরণ করা, তার নাফরমানীর মধ্যে বেঁচে থাকার চেয়ে উত্তম। (আল-হাদিস)

দ্বিতীয় পর্যায়ের দুই এবং তিন নম্বর রূপটিও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। দেশ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর সর্বস্ব ত্যাগ করতে বাধ্য হবার পর অথবা দেশের মাঝেই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা থাকার কারণে যদি কারও ধৈর্যচ্যুতি ঘটে, আদর্শিক বিপর্যয় ঘটে, হতাশা নিরাশার কারণে হাত পা ছেড়ে বসে পড়ে অথবা বাতিল শক্তির সাথে আপোষে চলে যায় বা জাহেলী সমাজ ব্যবস্থার সাথে আপোষ করে বসে, তাহলে তাকে বা তাদেরকে অবশ্যই ব্যর্থ বলতে হবে। কিন্তু এরপরও যারা সবর ও ইস্তিকামাতের পরাকাষ্ঠা দেখাতে পারে, তাদের পরাজয় নেই, ব্যর্থতা নেই, বরং তাদেরকে যারা বহিষ্কার করে, কোণঠাসা করে পরিণামে তারাই ব্যর্থ হয়, তারাই পরাজিত হয়।’’ (পৃষ্ঠা ৩৭-৩৮) এই বইটি তিনি বহুবছর আগে লিখলেও তার বাস্তব নমুনা শাহাদাতের পর নেতা কর্মীরা অনুধাবন করছে।

আইন শাস্ত্র সম্পর্কে যাদের ন্যূনতম জ্ঞান আছে তাদের কারো অজানা নয়, আইন যদি কালো হয়, ন্যায়ের পক্ষের না হয় সেই আইনে শাসকের ইচ্ছার প্রতিপলন হলেও ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না। আইনানুযায়ী বিচার মানেই যে ন্যায়বিচার নয় এ কথা আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ব্রিটিশ আদালতের বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক দিন আগেই বলে গেছেন। যা তার ‘জবানবন্দী’ গ্রন্থে লেখা আছে,‘(বিচারক) তবুও শাস্তি দেবে, কেননা সে সত্যের নয়, সে রাজার। সে ন্যায়ের নয়, সে আইনের। সে স্বাধীন নয়, সে রাজভৃত্য।’ শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী আল্লাহর রাহে নিজের জীবনকে সঁপে দিয়েছেন বলেই ইসলামী আন্দোলনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের একজন কর্মীর প্রত্যাশা থাকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শামিল হয়ে দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তি। শহীদ মাওলানা নিজামীকে যারা বারবার ভোট দিয়ে জাতীয় সংসদে পাঠিয়েছেন, সেই পাবনার সাঁথিয়াবাসীর কান্না দোয়া আর শ্রদ্ধায় অভিসিক্ত হয়ে চির নিদ্রায় শায়িত হলেন ইসলামী আন্দোলনের এই পুরোধা। যুগ যুগ ধরে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে তাঁর কর্মময় জীবন ও শাহাদাত অবশ্যই প্রেরণা যোগাবে। মহান আল্লাহর নিকট করজোর করে মিনতি করছি তিনি যেন দয়া করে এই গোলামের দোষ ত্রুটি ক্ষমা করে শাহাদাতের উচ্চ মর্যাদা দিয়ে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করেন।

Comments

comments