করোনায় বাসা খালি, ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল, ক্ষোভে ফুঁসছে গ্রাহকরা

দুই মাসের বিদ্যুৎ বিল একসঙ্গে। কিন্তু বিলের পরিমাণ প্রায় চার বা পাঁচ মাসের। করোনা পরিস্থিতিতে এমন ভুতুড়ে বিল পেয়ে অনেকে বিস্মিত। এমনকি করোনার সময় রাজধানীর অনেক পরিবার মাসভর গ্রামের বাড়িতে। ঘরে কোনো বিদ্যুৎ খরচ হয়নি। সে মাসেও দেখা গেছে স্বাভাবিক সময়ের মতো বিল ধরা হয়েছে। ১০-১২ গুণ বেশি বিল এসেছে অনেকের। ৪৫০ টাকার বিদ্যুৎ বিল হয়েছে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা। আর ৬-৭ হাজার টাকার বিল ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, মিটার না দেখে বিল করলেও পূর্বের রেকর্ড দেখে বিল করলে এতোটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতো না। এর নেপথ্যেও কারসাজি আছে। কোনো কোনো এলাকায় অতিরিক্ত বিল কাঁটছাট করার জন্য মিটার রিডাররা উপরি দাবি করছে। ভূতুড়ে বিল নিয়ে গ্রাহকদের ক্ষোভ এতোটাই বেড়েছে যে, তারা এ নিয়ে আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ভুক্তভোগি গ্রাহকরা জানান, মিটার রিডাররা কখনোই বাসায় গিয়ে বিল করে না। ফলে সমন্বয় কীভাবে করা হবে সেটা স্পষ্ট না। বিদ্যুৎ অফিসের কর্মচারি-কর্মকর্তাদের ব্যবহার নিয়েও অভিযোগ তাদের। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে তারা দুর্ব্যবহার করে থাকেন।

আবার কোনো কোনো এলাকার মিটার রিডাররা প্রদত্ত বিল পরিশোধের জন্য গ্রাহকদের চাপ দিচ্ছে। এমনকি লাইন কাটা হবে, জরিমানা হবে বলেও ভয় দেখাচ্ছে তারা। জুরাইন এলাকার এক গ্রাহক অভিযোগ করে বলেন, তার বাড়িতে চারটি পৃথক মিটারে মাসে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা বিল আসে। এবার এসেছে ৩৬ হাজার টাকা।

তারা বলছেন, বিল ধরিয়ে দিয়ে মিটার রিডার নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে বলেছে, টাস্কফোর্সের অভিযান শুরু হবে। তখন সমুদয় টাকা শোধ না করলে জেল জরিমানাও হতে পারে। ওই গ্রাহক বলেন, আমি বিদ্যুৎ অফিসে এই ভূতুড়ে বিলের কথা জানিয়েছি। তারা উল্টো প্রশ্ন করে- বিল নিয়ে তো অন্য কেউ প্রশ্ন তুললো না। আপনি একাই তুললেন কেন? মুরাদপুরের বাসিন্দা আসাদ শিকদার বলেন, বিদ্যুতের বিল নিয়ে ঘরে ঘরেই সমস্যা। কারো বাড়িতে সঠিক বিল আসেনি। বিদ্যুত বিভাগ ইচ্ছে করেই এই খামখেয়ালি করেছে। তাদের কাছে পূর্ববর্তি বিলের রেকর্ড আছে। সেই রেকর্ড দেখে বিল করলে এমনটা হতো না। এর নেপথ্যে তাই কোনো অনৈতিক উদ্দেশ্য দেখছেন তিনি।

করোনাভাইরাসের প্রার্দুভাবের কারণে তিনমাস সরকার ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তিন মাসের আবাসিক গ্রাহকের বিদ্যুতের বিল নেওয়া বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। কিন্তু তিনমাস পর এই ১০-১২ গুন বিল আসায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। প্রায় সারা দেশেই এই ভুতুড়ে বিলের শিকার হয়েছেন তারা।

রাজধানীর দুই বিতরণ সংস্থা ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি সমিতির গ্রাহকের এই অবস্থা। এছাড়া একই অভিযোগ উত্তরের কয়েকটি জেলায় বিতরণ সংস্থা নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানী লিমিটেড (নেসকো), দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার বিতরণ সংস্থা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্টিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) এবং দেশের সীমিত এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গ্রাহকদের।

এদিকে গ্রাহকদের এমন আন্দোলনের ঘোষনার পর বিদ্যুৎ বিভাগ এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়ে বলেছে, গ্রাহকদের অতিরিক্ত কোনো বিল দিতে হবে না।

গত শনিবার বিদ্যুৎ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কোনো কোনো গ্রাহকের মধ্যে কিছু বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ গ্রাহকদের উদ্দেশে এতে আরও বলা হয়, মহামারি করোনার বিস্তার রোধে বর্তমানে অনেক গ্রাহকের আঙ্গিনায় সরেজমিন গিয়ে মিটার রিডিং গ্রহণপূর্বক বিদ্যুৎ বিল প্রস্তত করা হচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন এলাকায় লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বাধ্যবাধকতার ফলে গ্রাহক ও বিদ্যুৎ কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ গ্রাহকদের আগের মাসের বা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের বিলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাক্বলিত বিল প্রদান করা হচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকার ইতিমধ্যে করোনা সংক্রমণ বিস্তার রোধে গ্রাহকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসের বিদ্যুৎ বিলের বিলম্ব মাসুল মওকুফ করেছে। ফলে কোনো প্রকার বিলম্ব মাসুল ছাড়াই ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিলের বিল আগামী ৩০ জুনের মধ্যে পরিশোধ করা যাবে। বিদ্যুৎ বিল নিয়ে কারো জিজ্ঞাসা বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানোর অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। একই সঙ্গে ব্যাংকে বিল পরিশোধের পাশাপাশি সুবিধা অনুযায়ী বিকাশ/নিজস্ব বুথ/ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।

প্রাক্কলিত বিলের সঙ্গে গ্রাহকের প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ কম/ বেশি বা কোনো অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হলে পরবর্তী মাসের বিলের সঙ্গে তা সমন্বয় করা হবে। কোনো অবস্থাতেই ব্যবহৃত বিদ্যুতের বেশি বিল গ্রাহককে পরিশোধ করতে হবে না।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্স করে সবগুলো বিতরণ সংস্থার প্রধানকে বলে দিয়েছেন গ্রাহক বাড়তি বিল যেন দিতে না হয়। বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহক অসন্তোষ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। গ্রাহকের অধিকার রয়েছে জানার কেন এমন বিল দেওয়া হচ্ছে; পরবর্তীতে কীভাবে তা সমন্বয় করা হবে সেটিও বলতে হবে। এর ব্যতয় যারা ঘটাবে তারা শাস্তি পাবে।

Comments

comments