জীবন সুস্থ করতে এসে জীবনই দিতে হলো!

হায়রে জীবন! হায়রে মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি!! দেশের সবচেয়ে এলিট শ্রেণির এলাকার হাসপাতালে চোখের সামনে পুড়ছে মানুষ; বাঁচানোর চেষ্টার বদলে ভিডিও করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কয়েকজন। অফিস থেকে গিয়ে ভর্তি হলেন হাসপাতালে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাশ! ঘরের ভিতরে বাঁচার জন্য আহাজারি করেও বাঁচতে পারেননি। জীবন সুস্থ করতে এসে জীবনই দিতে হলো নিষ্ঠুর পৃথিবীকে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা রিয়াজুল আলম লিটন (৪৫) চাকরির পাশাপাশি সমাজসেবায় জড়িত ছিলেন। জড়িত ছিলেন লায়ন্স ক্লাবের সঙ্গে। ঈদের দু’দিন পর গত বুধবার গুলশানের একটি বায়িং হাউজে অফিস করছিলেন। শরীর গরম অনুভব করায় করোনা সন্দেহে সহকর্মীরা পরীক্ষার জন্য নিয়ে যান পাশের ইউনাইটেড হাসপাতালে। পরীক্ষার নমুনা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করে নেন। প্রহর গুনছিলেন পরীক্ষার ফলের জন্য।

পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেও চিকিৎসা করার প্রয়োজন হলো না তার। হাসপাতালের আগুনে পুড়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হলো। বাঁচার জন্যই হাসপাতালে ভর্তির পর লাশ হয়ে ঘরে ফিললেন সম্ভাবনাময়ী লিটন। দিনাজপুরের বীরগঞ্জের লিটনের মতোই করোনা থেকে নিজেকে বাঁচাতে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি হন মো. মাহবুব (৫০), মো. মনির হোসেন (৭৫), ভারনন অ্যান্থনি পল (৭৪) ও খাদেজা বেগম (৭০)। স্বাস্থ্যসেবা এবং চিকিৎসা নিতে গিয়ে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যান সকলেই।

বুধবার রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে অগ্নিকাÐের ঘটনা ঘটে। খবর পায় ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট কাজ করে রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে পাঁচজন রোগী পুড়ে নিহত হন। এদের মধ্যে চারজন পুরুষ ও একজন নারী। নিহতদের মধ্যে রিয়াজুল আলম লিটনকে গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জের সুজালপুর গ্রামে ও অন্যান্যদের ঢাকায় দাফন করা হয়। গুলশান থানার ওসি (অপারেশন) শেখ শাহানুর রহমান জানান, মাহবুব ১৫ মে, মনির হোসেন ১৬ মে, অ্যান্থনি পল ও খোদেজা বেগম ২৫ মে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

ইউনাইটেড হাসপাতারে অগ্নিকাÐে নিহত রিয়াজুল আলম লিটনের বড় ভাই রইসুল আজম ডাবলু জানান, নিহত লিটন স্ত্রী ফৌজিয়া আক্তার জেমি ও সাত বছরের সন্তান আসমাইন ফিয়াজকে নিয়ে রাজধানীর শ্যামলীতে থাকতেন। বিদেশি একটি বায়িং হাউজের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করতেন। বুধবার অফিসে যাওয়ার পর শরীরে তাপমাত্রা একটু বেশি হওয়ায় করোনা পরীক্ষা করতে তিনি হাসপাতালে যান। বিকালে তার শরীর থেকে নমুনা নিয়ে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করেন করোনা পরীক্ষার ফলাফলের জন্য। ফলাফল নেগেটিভ পাওয়ার সঙ্গে পেলেন লাশও।

মেয়াদোত্তীর্ণ ফায়ার এক্সটিংগুইশার : বুধবার রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে ইউনাইটেড হাসপাতালের বর্ধিত অংশে আগুন লাগালে মেয়াদোত্তীর্ণ ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ইউনাইটেড হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরা। ফায়ার এক্সটিংগুইশার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় সেগুলো কোনো কাজই করেনি। অতঃপর ফায়ার সার্ভিস গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

গতকাল ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (ঢাকা বিভাগ) দেবাশীষ বর্ধন ইউনাইটেড হাসপাতালের অগ্নিকাÐ পরিদর্শন করে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ফায়ার হাইড্রেন্ট থাকলেও তা ফায়ার সার্ভিস আসার আগে ব্যবহার করা হয়নি। আগুন আরও আগে লাগলেও আমরা কন্ট্রোল রুমে তথ্য পেয়েছি রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে। আমাদের ইউনিটগুলো আসার পর দেখেছে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ফায়ার ফাইটাররা আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সেগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল। অগ্নিনির্বাপণ করার পর আমরা পাঁচটি লাশ উদ্ধার করেছি।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, আগুন লাগার কারণ তদন্ত করতে গিয়ে বৈদ্যুতিক তার, বিভিন্ন ডিভাইস, এসির ভেতরে থাকা দাহ্য পদার্থ ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনা রেখে কাজ করা হচ্ছে। ভেতরে এসি ছিল, অনেক ইলেকট্রিকাল ডিভাইস ছিল, এসিগুলো নেগেটিভ প্রেসারে ছিল। আমরা সবগুলো খতিয়ে দেখছি। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নামে মাত্র ইউনিট খুলে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল কিনা, জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ঢাকা বিভাগের এই উপপরিচালক বলেন, অবকাঠামো দেখে তাই মনে হচ্ছে। এ ধরনের রোগীর ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল।

উৎসুক জনতার ভিডিও : ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে শীততাপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বিস্ফোরণে যখন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে, ভিতরে পাঁচজন মানুষ জীবন বাঁচাতে চিৎকার করছেন; তখন জড়ো হয় আশপাশের মানুষ। উৎসুক জনতার কেউ কেউ আগুন না নিভিয়ে ভিডিও করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সাধারণ মানুষের এই কান্ডজ্ঞানহীন আচরণে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভিতরে আগুনে পুড়ছে মানুষ; অথচ অনেকেই ভিডিও করছে। মানুষের কান্ডজ্ঞান দেখে অনেকটাই অবাক হতে হয়। চোখের সামনে আগুন জ্বলছে, সেটা নেভাতে এগিয়ে না গিয়ে ভিডিও ধারণ করতেই ব্যস্ত সবাই। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী বলেন, আমরা বুঝতে পারি না, যেখানে এভাবে আগুন জ্বলছে, সেখানে সাধারণ উৎসুক জনতা সাহায্যে এগিয়ে আসা বাদ দিয়ে ভিডিও ধারণেই ব্যস্ত হয়ে যায়। এসব ভিডিও দিয়ে তারা কী করবে, এমনই প্রশ্ন জাগে মনে। অনেকে তো এমন অতি উৎসাহী যে ভিডিও ধারণ করার জন্য একেবারে আগুনের কাছাকাছি চলে আসে, এতে করে আমাদের কাজেও বাধা সৃষ্টি হয়।

ফায়ার সার্ভিস পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান জানান, আগুনের খবর পেয়ে তাদের তিনটি ইউনিট হাসপাতালে যায়। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে হাসপাতালের নিচ তলার এসি বিস্ফোরণে এই আগুন লেগেছে। গিয়ে দেখি প্রচÐ ধোঁয়া উড়ছে। ওই পাঁচ করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের হাতে আসা ভিডিওতে দেখা যায়, তাদের ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগে থেকেই সেখানে উৎসুক জনতার ভিড় লেগেছিল। তবে সেই জনতা আগুন নেভাতে এগিয়ে না এসে বরং ভিডিও ধারণ করাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাই হতবাক হয়েছেন।

গুলশান থানার ওসি মো. কামরুজ্জামান বলেন, হাসপাতালের বাইরের দিকে করোনা রোগীদের জন্য যে তাঁবু টানিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেখানে আগুন লাগে।

থানায় মামলা তদন্ত শুরু : গুলশানের রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গতকাল গুলশান থানায় ওই মামলাটি করা হয়। গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম কামরুজ্জামান জানান, হাসপাতালের ব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন ও সিকিউরিটি) মেজর (অব.) মঈনুল হোসাইন মামলাটি দায়ের করেন। তবে ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যরা এখন পর্যন্ত কোনও মামলা দায়ের করেনি। অগ্নিকাÐ নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে বলেও জানান তিনি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গুলশান ডিভিশনের ডিসি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, অগ্নিকান্ডে নিহত পাঁচজনের মধ্যে তিনজনই করোনভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষও তদন্ত কমিটির গঠন করেছে বলে জানা গেছে।

Comments

comments