উপকূলের কান্না শুনতে কি পান?

আবরার শাহরিয়ার

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা প্রভৃতিকে আমরা মৌলিক অধিকার বলে থাকি। এগুলো হচ্ছে জীবনধারণের মৌলিক উপকরণ। দেশের মানুষ যখন এসব উপকরনের জন্য রোজ যুদ্ধ করে চলছে ঠিক তখন বাসস্থানতো দুরের কথা মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলছে না উপকূলবাসীর। একটি টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা। সরকারের পক্ষ থেকে নেই কোন উদ্যোগ।

সম্প্রতি অতি শক্তিশালী সাইক্লোন আম্পান বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলে আঘাত হানার পর দুদিন পার হয়ে গেলেও এখনো দক্ষিণাঞ্চলের অনেক গ্রাম পানিতে ডুবে আছে। এসব এলাকায় বাড়িঘর, এবং কৃষিজমি ও চিংড়ি ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দুর্গত মানুষদের কাছে কিছু কিছু ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়, এবং ভেঙে পড়া বাঁধগুলো এখন পর্যন্ত মেরামত না হওয়ায় এখনো বিস্তীর্ণ এলাকা জোয়ারের পানিতে ডুবে আছে। এই চিত্র শুধু এবারের নয় ঘুর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই উপকূল এলাকার রোজকার দিন এভাবে চলে। দীর্ঘ এগারো বছর অতিক্রম হলেও নেই কোন শক্ত বাঁধের ব্যবস্থা। আইলা, নার্গীস, ফনি, বুলবুল, এভাবে একের পর এক ঝড়ে লন্ডভন্ড করে দিলেও সরকারিভাবে বাঁধের কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি। জনপ্রতিনিধিরা বার বার আশ্বাস দিলেও এখনও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেটাও সম্ভব হয়নি।

পানিতে তলিয়ে গেছে মাইলের পর মাইল জনপদ। গৃহহারা হয়েছেন লাখ মানুষ। আর একরের পর একর ফসলি জমি পরিণত হয়েছে কুলকিনারাহীন নদীতে। সাইক্লোন আম্পানের তাণ্ডবের পর এমন অবস্থায় পড়ে রয়েছে খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনার উপকূলীয় এলাকা। দেখা গেছে দেশের ২৬ জেলায় এই পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ও বরগুনা। গত ২২ মে হেলিকপ্টারে আকাশ থেকে আম্পান দুর্গত এলাকা দেখে, ভাসানচরে নামলেন মন্ত্রীরা। তবে ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে বললেন, আম্পানে একটি ঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। জীবনযাত্রা রয়েছে স্বাভাবিক।

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানাধীন গাবুরা ইউনিয়ন। নদীবেষ্টিত ইউনিয়নটিতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। স্থানীয়দের অনেকে দিন পার করছেন নৌকায়। দেখা দিয়েছে খাদ্যের সংকট। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে আগ্রহী নন তারা। তাই রাত-দিন পার করছেন নৌকাতেই।

স্থানীরা বলছেন, বাংলাদেশের ভেতরে সবচেয়ে বেশি বাগদা চিংড়ির চাষ হয়- এই গাবুরায়। প্রচুর চিংড়ি এখানে উৎপাদন হয়। কিন্তু সেই ঘেরগুলা সব নদীতে ভেসে গেছে, মানুষের প্রচণ্ড ক্ষতি হয়েছে। সে ক্ষতির কোন সীমা নেই। ঝড়ের পর পুরা তিনটা গ্রাম পানির নিচে, দেখলে মনে হবে ছোট ছোট দ্বীপ। এখন সেখানের মানুষের একটাই দাবি – ‘আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা একটা নিরাপদ আর শক্ত বেড়িবাঁধ চাই।’ যাতে মানুষকে বারবার দুর্ভোগ পোহাতে না হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে এই দ্বীপের যে বাঁধ দেওয়া রয়েছে এটা ২০ বছর আগেকার। এরপর সরকারি উদ্যোগে নতুন কোন বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। কোন প্রকার দূর্যোগ দেখা দিলে এলাকার মানুষের স্বেচ্ছাশ্রম ও কয়েকটি এনজিওর সহায়তায় বাঁধ মেরামত করা হয়। যা টেকসই হয় না বরং পর্বর্তিতে আরও বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সরকার বলছে, বাঁধের জন্য আলাদা কোন বরাদ্দ নেই নিজ উদ্যোগে নির্মান করতে হবে বাঁধ। কিন্তু বাস্তবতা দেখা যায়, ভুক্তভোগীরা নিজ শ্রম দিয়ে ক্ষণিক সংস্কার করলেও প্রতিবছরই স্বীকার হচ্ছে বন্যায়। হাজার হাজার মানুষ হারাচ্ছে বসতভিটা।

এই দ্বীপে ফণী ও বুলবুলের পর দু’-দু’বার মন্ত্রী এসেছেন, সচিব এসেছেন। অনেক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন; কিন্তু এখন পর্যন্ত সেসবের কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। যেটুকু হয়েছে মেরামত বা জোড়াতালি।

শুধু গাবুরা নয় ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রলয়ের পর উঠে দাঁড়াতে পারেনি দেশের পশ্চিম উপকূল। সেই ক্ষতে বারবার আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড়। মাত্র ছ’মাস আগে বুলবুল, এক বছর আগে ফণীর গতি ছিলো এদিকেই। একই পথে ঘূর্ণিঝড় আম্পানও সবাইকে নিস্ব করে দিয়ে গেলো।

সুন্দরবন লাগোয়া তিনটি উপকূলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার প্রান্তিকের বহু জনপদ দুর্যোগের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত। একবার দুর্যোগ এলে উঠে দাঁড়াতে সময় লাগে যুগের পর যুগ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার সুযোগ থাকে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে লবণ পানি যেসব এলাকা ভাসিয়েছে; সেখানে আর ফসল হচ্ছে না। সবুজ শূন্য হয়েছে অনেক জনপদ। পেশা বদলে গেছে সেই জনপদের বাসিন্দাদের। সুপেয় খাবার পানির সংকট তীব্র হয়েছে। তাই এসব উপকূলবাসীর দাবি টেকসই বেড়িবাঁধ, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, সুপেয় পানি আর বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট সংস্কার।

চলে গেলো পরিবেশ দিবস। উপকূলের মানুষেরা এবার দাঁড়াতে শিখেছেন। তরুণরা জেগে উঠেছে উপকূল রক্ষার কাজে। উপকূলের এসব মানুষের কান্না কি আদেও দরবার পর্যন্ত পৌঁছাবে।

Comments

comments