ফ্লয়েড হত্যার স্ট্যাইলে বাংলাদেশে কিশোর নির্যাতন ( ভিডিও)

দোকান থেকে সিগারেট কিনে জাল নোট দেয়ার অপরাধে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে ঘাড়ে চাপা দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেছে পুলিশ। এই ঘটনার প্রতিবাদে সারা বিশ্ব যখন একাট্টা তখন তারই অনুকরণে বাংলাদেশের রংপুরে মুমিনুল ইসলাম নামের (১৫) এক যুবকের উপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে আশরাফ আলী লাল নামের এক ব্যবসায়ী। লালমনিরহাটের মিশন মোড়ে মঙ্গলবার রাতে অটো রিক্সার জারকিন থেকে তেল চুরির অভিযোগে কিশোরের মাথায় পা দিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে দাড়িয়ে ছিলেন ব্যবসায়ী। এ ঘটনায় হতবম্ব সবাই।

অন্যদিকে রংপুর মহানগরীর আজাদ হোটেলের প্রতিবন্ধি শ্রমিক বাবুকে মালিক আনছার আলী ও পুত্র আজাদ কর্তৃক পাইপ দিয়ে মারধোরের ঘটনা সবাইকে অবাক করে দিয়েছে।

লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা জানান, মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে মমিনুল ইসলাম নামের ওই কিশোরকে নির্যাতনের স্থিরচিত্র ও একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এরপরই বিষয়টি নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু করে। মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে ঘটনার সাথে জড়িত নির্যাতনকারী জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী লালকে গ্রেফতার করা হয়। মমিনুল বাদি হয়ে একটি মামলাও করেছে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, আমরা প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পারি জন্মের ৩ মাসের মাথায় কিশোর মমিনুল ইসলামকে (১৫) লালমনিরহাট রেলস্টেশনে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় স্বজনরা। এরপর তাকে লালমনিরহাট পৌরসভার চাঁদনী বাজার এলাকার নুর মোহাম্মদ ও গোলাপী বেগম দম্পতি কুড়িয়ে নিয়ে সন্তান হিসেবে লালন পালন করেন। দিনমজুরি করে সংসার চালালেও করোনায় কাজ বন্ধ থাকায় অনাহারে-অর্ধাহারে সংসার চলছিল তাদের। একই সাথে মা গোলাপী বেগম দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। টাকার অভাবে চিকিৎসাও করা যাচ্ছিল না।

পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাতে মমিনুল জানিয়েছে, মায়ের চিকিৎসার জন্য বাড়ি থেকে বের হয় মমিনুল। মঙ্গলবার সকালে লালমনিরহাট শহরের মিশন মোড়ে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা থেকে দুই লিটার তেল চুরি করে কিশোর মমিনুল ইসলাম। কিন্তু ধরা খেয়ে যায় জনতার হাতে। তবে জনতা তাকে কিছু না বললেও চুরি করার অপরাধে লালমনিরহাট জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী লাল ঘটনাস্থলে এসে তাকে মারধর শুরু করেন। এক পর্যায়ে ওই কিশোর নিজেকে বাঁচাতে আশরাফ আলীর পা ধরে ক্ষমা চাইলেও তিনি তাকে পিটাতে থাকেন।

এদিকে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, প্রভাবশালী ব্যাবসায়ি আশরাফ আলী লাল কিশোরের মুখে তার পা দিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছে। যাতে কিশোরটি কোনো কথা বলতে না পারে। এছাড়াও কিশোরের মুখ, হাত, পাসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ওই ব্যবসায়ী পা দিয়ে সজোরে সজোরে আঘাত করছে। আর ছেলেটি চাচা চাটা বলে চিৎকার করে মাফ চাইছে। কিন্তু ব্যবসায়ী লাল কিশোরটি যতই মাফ চাইছে ব্যবসায়ী লাল ততই নির্যাতনের মাত্রা বাড়াচ্ছে। পা দিয়ে মুখ ও গলা চেপে ধরেছেন। ভিডিওটিতে দেখা যায়, সেখানে ১০/১১ জন মানুষ রয়েছেন। কেউ ওই ব্যবসায়ীকে নিবৃত করতে আসে নি।

এ ঘটনায় হতবাক পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা। তিনি বলেন, করোনা যেখানে মানবিকতা সেখানোর কথা। সেখানে এভাবে অমানবিক হয়ে উঠার বিষয়টি খুবই দু:খজনক। এ ঘটনার যথোপুযুক্ত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

লালমনিরহাট সদর থানার ওসি মাহফুজুল হক জানান, এ ঘটনায় নির্যাতিত কিশোর মমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। মামলার আসামী করা হয়েছে লালমনিরহাট জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী লালসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে। এ ঘটনায় ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

হাত পা বেঁধে পাইপ দিয়ে নির্যাতন
অন্যদিকে রংপুর মহানগরীর আজাদ হোটেলে বাবু মিয়া (২৪) নামে এক প্রতিবন্ধী হোটেল শ্রমিককে চুরির অপবাদ দিয়ে হাত পা বেঁধে পাইপ দিয়ে নির্মম নির্যাতন করেছে হোটেল মালিক ও তার পুত্র। এ ঘটনায় এ ঘটনায় অভিযুক্ত হোটেল মালিক আনসার আলীকে গ্রেফতার করেছে তাজহাট থানা পুলিশ।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তাজহাট থানার উপ-পরিদর্শক মামুনুর রশীদ জানান, লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মোজাম্মেল হোসেনের ছেলে বাবু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে রংপুর মহানগরীর মডার্ণ মোড়ের শাহীন হোটেলে কাজ করতেন। কিন্তু করোনায় শাহীন হোটেল বন্ধ হলেও পাশের আজাদ হোটেলে কাজে যোগ দেন। করোনায় সাধারণ ছুটি দীর্ঘ হওয়াতে শাহীন হোটেলের মতো আজাদ হোটেলও বন্ধ হয়ে যায়। তখন প্রতিবন্ধী বাবু মিয়া হোটেলের মালিক আনছার আলীকে চাবিসহ হোটেলের সবকিছু বুঝিয়ে দেয়। পরবর্তীতে সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ায় শাহিন হোটেল আবারও খুললে বাবু সেখানে কাজ শুরু করেন। এর কিছুদিন পর আনছার আলী তার হোটেল চুরি হয়েছে বলে দাবি করে তাজহাট থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করে।

গত সোমবার সন্ধ্যায় আনছার আলী ও তার ছেলে আজাদ মিলে শাহীন হোটেলের সামনে থেকে প্রতিবন্ধী বাবু মিয়াকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর বাবুর হাত-পা বেঁধে বাবা-ছেলে মিলে লোহার পাইপ দিয়ে মারধর করেন। প্রতিবন্ধী বাবু হাত-পা ধরে ক্ষমা চেয়ে চুরি করেননি বলে আর্তনাদ করলেও প্রায় দেড় ঘণ্টা তাকে অমানবিক নির্যাতন চালায়। লোহা গরম করেও আঘাত করা হয়। এতে বাবুর পা জখম হয় ও ডান হাত ভেঙ্গে যায়। পরে স্থানীয় জনগণ ও পুলিশ আহত অবস্থায় বাবুকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়।

এ বিষয় আজাদ হোটেল মালিক আনছার আলী পুলিশকে দোষারোপ করে জানান, আমাদের অভিযোগের গুরুত্ব পুলিশ দেয় নাই। মালামাল উদ্ধারও করে নাই। তাই আমরা তাকে এনে চুরির মাল উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলাম।

এ বিষয়ে তাজহাট থানার উপ-পরিদর্শক মামুনুর রশীদ বলেন, এ বিষয়ে একটি মামলা হয়েছে। অমানবিকভাবে প্রতিবন্ধী ওই শ্রমিককে চুরির অপবাদে নির্যাতনের অভিযোগে হোটেল মালিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছি।

তথ্য সূত্র: নয়াদিগন্ত

Comments

comments