তরুণদের সফলতা কেবল বিসিএসেই?

ড. শাহ্‌জাদ হুসাইন

কয়েক বছর যাবৎ কোনো একটা বিসিএসের ফল প্রকাশিত হলে সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যম ব্যাপক উৎসাহ–উদ্দীপনা নিয়ে পাস করা তরুণদের সফলতার গল্প প্রচার করে। ব্যাপারটা খুবই চমৎকার। তবে সফলতা অর্জন কিন্তু এ দেশের শুধু বিসিএস পাস করা তরুণেরাই করেন না; এ দেশের তরুণেরা অনেকেই সারা বিশ্বে অনেক ক্ষেত্রে অনেকভাবে সফলতা দেখাচ্ছেন। প্রতিবছর মার্চ, এপ্রিল কিংবা সেপ্টেম্বর, অক্টোবর মাসে এ দেশের অনেক মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ নিয়ে সারা বিশ্বের বহু দেশে যান। সংখ্যাটা হয়তো বিসিএসয়ের মতো হাজার হাজার নয়, তবে কমও নয়। এটা কিন্তু আরও অনেক বড় সফলতা—বিশ্ব সফলতা। আপনারা হয়তো জানেন, তাঁরা হলেন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করা সবচেয়ে মেধাবী তরুণ। তাঁদের অনেকেই বিসিএস নামক একটা পরীক্ষা আছে, সেটা জানেন। কিন্তু এসবে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামান না।

জীবনের ১৬ থেকে ১৮ বছরের ছাত্রজীবনের সবচেয়ে পরিশ্রমী, মেধাবী, সবচেয়ে সফল তরুণ তাঁরা। তাঁদের মাথা ভর্তি থাকে বিষয়ভিত্তিক চিন্তা। তাঁদের অনেকে বিদেশে গিয়ে দেশের টাকাপয়সার এক চুল পরিমাণও খরচ না করে অনেক বড় সফলতা দেখাচ্ছেন। আর এ জন্যই আমরা আজ সারা বিশ্বে অনেক সফল শিক্ষক, অধ্যাপক, বিজ্ঞানী, সফটওয়্যার প্রকৌশলী এবং আরও বিভিন্ন পেশার অনেক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে পেয়েছি। সফল এসব মানুষকে নক্ষত্র বলেছি, কারণ তাঁদের অবদান সারা বিশ্বে দীর্ঘকাল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলে, টিকে থাকে। তাঁদের অনেকে এমআইটি, নাসা, হার্ভার্ড, প্রিন্সটনসহ পৃথিবীর বহু বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে আছেন। সব সময় তাঁরা বিভিন্নভাবে (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে) দেশকে উন্নত, মর্যাদাশালী করে তোলেন এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছেন। এই মানুষগুলো কিন্তু দেশকে খুব ভালোবাসেন। সময়–সুযোগ পেলেই দেশের জন্য দেশের হয়ে কাজ করেন। বিদেশে থেকেই দেশের জন্য বিভিন্নভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁদের নিয়ে কি গণমাধ্যমে আরও বেশি আলোচনা হতে পারে না?

অনেকে অনেক সময় মনের অনেক কষ্ট থেকে দেশ ছেড়ে চলে যান। তাঁদের অনেকে কী কারণে, বুকে কী নিদারুণ কষ্ট নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যান বা যাচ্ছেন, সেটাও দেখুন। এই মেধাবীদের যাঁরা অনেকে দেশে চাকরি করেন কিংবা উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে এসে চাকরি করেন, তাঁদের অনেকে কী কারণে সব যোগ্যতা থাকার পরও প্রমোশন পান না, অন্য পেশাজীবীদের মতো সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান না, সেটাও লিখুন।

স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে ভালো ও মেধাবী তরুণদের কেন নিজ নিজ বিষয়ে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে শিক্ষকতা, গবেষণা, চিকিৎসা, কৃষি, প্রকৌশল ও নিজ নিজ বিষয়ের অন্যান্য পেশায় থাকা উচিত, সেটা নিয়েও লিখুন। দেশের উন্নয়নে এ পেশাজীবীর মানুষগুলোর কেন প্রয়োজন, কীভাবে প্রয়োজন, সেটাও লিখুন। এ পেশাজীবীর মানুষগুলোর দেশের জন্য ভালো ভালো এবং বড় বড় কাজ করতে কী কী প্রয়োজন, কেন প্রয়োজন, সেটাও লিখুন। ভবিষ্যতে মেধাবীদের নিজ নিজ বিষয়ে পেশায় না এলে সরকার তথা দেশ ও প্রার্থী কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেটাও লিখুন।

অনেক সময় গ্রামগঞ্জে রাস্তাঘাট, ক্লাব বা চায়ের স্টলে বসলে অনেককে বলতে শোনা যায়, ওই লোকটা সরকারি চাকরিতে ভালো অবস্থানে ছিলেন বা আছেন। তিনি চাইলে এলাকার ছেলেপেলেদের চাকরি দিতে পারতেন/পারেন। কিন্তু দেন না! প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব নীতি–আদর্শ, বিচার–বিশ্লেষণ, জীবনধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। একটা পেশার মানুষের কাজের ক্ষমতা বা সীমা পরিসীমাও থাকে। এক পেশার একজন চাইলেই সমাজের অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারেন না। আসুন আগে দেখি, এই মানুষটা বা মানুষগুলো তাঁর সুবিধামতো অবস্থানে থেকে নিজের এলাকার কোনো ব্যক্তির জন্য কিছু না করে এলাকার রাস্তাঘাট, অবকাঠামো, পানি, বিদ্যুৎ কিংবা স্কুল–কলেজসহ যেগুলোয় এলাকার সবাই উপকৃত (বেনিফিটেড) হয়, সে কাজগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে দেখেছেন কি না? যদি দেখেন, উনি আপনার একার বা কারও ব্যক্তিস্বার্থ না দেখে সবার স্বার্থে এসবের কিছু করার চেষ্টা করছেন বা করেছেন, তাহলে বুঝবেন, তিনিই আপনার কাছের মানুষ! তাঁদের অবদানকে মনে রাখুন, প্রশংসা করুন। সব সময় প্রচার করুন যাতে পরবর্তী সময়ে তিনি আরও কিছু করতে উৎসাহ পান। কারও কোনো ধরনের দুর্নীতিকে নিরুৎসাহ করুন।

আর একবার বিদেশে কর্মরত এক মেধাবী বাঙালি অধ্যাপককে বলেছিলাম, ‘স্যার, দেশে গেলে গ্রামে যান? সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশেন?’ বলেন, ‘যাই, মিশি। কিন্তু সাধারণ মানুষ মাঝেমধ্যে বলেন, কী করেন এত বছর বিদেশে থেকে, বড় বড় দেশ ঘুরে আমাদের বা আমাদের ছেলেমেয়েদের বিদেশ নেন, বিদেশে নিয়ে কাজ দেন! প্রয়োজনে টাকাপয়সা নেন!’ তিনি আমাকে বলেন, ‘বলো, আমি কি চাইলেই যাকে–তাকে বিদেশ আনতে পারি? আমি কি আদম ব্যাপারী?’ তিনি আরও বলেন, ‘তাই গ্রামে গেলে মাঝেমধ্যে খুব লজ্জা পাই।’

গত কয়েক যুগে সমাজে মেন্টরের সংজ্ঞায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। আগে সমাজে মেন্টর হতো সফল কিন্তু দেশপ্রেমিক, মেধাবী ও সৎ মানুষ। এখন সমাজে মেন্টর হচ্ছে মাথা ও পেট মোটা, অসৎ, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ কিংবা উচ্চ বেতনের লোভে ফেলানো বিদেশি দুর্নীতিবাজদের দালাল ও আদম ব্যাপারী। যিনি উচ্চ বেতনের চাকরি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ১৫–২০ লাখ টাকার বিনিময়ে ইউরোপে নেওয়ার কথা শুনিয়ে দেশের তরুণদের ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবিয়ে মারেন কিংবা বিদেশে কোথাও নিয়ে দরজা–জানালাবিহীন কোনো আবদ্ধ রুমে দিনের পর দিন না খাইয়ে রেখে গুলি করে মারা জঘন্য ব্যবসায়ী। এ যুগে আসলে সারা জীবন সৎ থেকে, স্কুল–কলেজে ফার্স্ট-সেকেন্ড থেকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম/দ্বিতীয়/তৃতীয়/…হয়ে দেশ-বিদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সেরা শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী হয়েও এ সমাজে দাম নেই! সমাজ যথেষ্ট আধুনিক হয়েছে! আর এটাই হলো সামাজিক অবক্ষয়। এটাই হলো ধ্বংসের শেষ বা কাছাকাছি সীমানা।

এমন সমাজ দিয়ে কখনো, কোনো দিনই দেশ উন্নত বিশ্বের কোথাও বা তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারবে না। উন্নত হতে হলে সরকারকে যেমন ভালো ভালো পদক্ষেপ নিতে হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের মানসিকতারও উন্নতি হতে হবে।

লেখক: নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন।

Comments

comments