কবি আল মাহমুদের জন্মবার্ষিকী ও একটি অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

(ছবিতে শামসুর রাহমানের পাশে নামাজরত আল মাহমুদ)

সমকালীন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের জন্মদিন আজ। ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল গ্রামের মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, আত্মজীবনীসহ বিভিন্ন বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন বরেণ্য এই কবি।

আল মাহমুদের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘সোনালী কাবিন’, ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘একচক্ষু হরিণ’, ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’, ‘আমি দূরগামী’, ‘দ্বিতীয় ভাঙন’, ‘উড়ালকাব্য’ ইত্যাদি। ‘কাবিলের বোন’, ‘উপমহাদেশ’, ‘ডাহুকি’, ‘আগুনের মেয়ে’, ‘চতুরঙ্গ’ ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। ‘পানকৌড়ির রক্ত’সহ বেশকিছু গল্পগ্রন্থও রচনা করেছেন তিনি। এ ছাড়া ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ তার আত্মজীবনী গ্রন্থ।

সৃজনশীল সাহিত্য রচনার জন্য অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন আল মাহমুদ। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, শিশু একাডেমি (অগ্রণী ব্যাংক) পুরস্কার, কলকাতার ভানু সিংহ সম্মাননা উল্লেখযোগ্য।

আল মাহমুদের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার:

নাসির আলী মামুন: আমার লেখা শামসুর রাহমান আল মাহমুদ: তফাৎ ও সাক্ষাৎ বইটি আপনার হাতে দেব বলে আমি নিজে এসেছি।

আল মাহমুদ: না, থাক্ থাক্…। আমি দেখেছি।

মামুন: আপনি নিতে চাচ্ছেন না!

মাহমুদ: পড়েছি। তুমি শামসুর রাহমানে ঘেটু। তাঁকে গ্লোরিফাই করা হয়েছে। তোমার সাক্ষাৎকারে আমাকে খানিকটা খাটো করার চেষ্টা আছে।

মামুন: আপনি কি (শামসুর রাহমান আল মাহমুদ: তফাৎ ও সাক্ষাৎ) বইটি পড়েছেন?

মাহমুদ: আমাকে প্রকাশক দিয়ে গেছে। পড়েছি।

মামুন: তাহলে যে বলেন আপনি এখন কোনো বই পড়তে পারেন না। মাঝেমধ্যেই আফসোস করেন যে চোখে দেখেন না। কিন্তু কীভাবে পড়লেন?

মাহমুদ: তুমি কি আমাকে জেরা করতে এসেছ?

মামুন: না না। বইটি গ্রহণ করেন।

মাহমুদ: দাও, এখানে রাখো। এটা শামসুর রাহমানের বাসায়, প্রচ্ছদের ছবিটা দারুণ। ওঁর সঙ্গের ছবিটা একটা প্রিন্ট করে দিয়ো।

মামুন: যাঁকে পছন্দ করেন না। তাঁর ছবি ঘরে রাখবেন!

মাহমুদ: আমি তো কখনো বলিনি। তোমরাই আমার কাছে এসে নানান কথা বলেছ, তারপর…।

মামুন: এই দলে কখনোই আমি ছিলাম না।

মাহমুদ: কিন্তু তোমার বন্ধুরাই বলেছে।

মামুন: তাদের দু-চারজনের নাম বলেন, শুনি।

মাহমুদ: ওই তো ওরাই। তরুণ কবিরা। তোমার বই পড়ে শুনিয়েছে। সেখানে শামসুর রাহমানের অংশই নাকি বেশি। আমার স্পেস কম। আমি পড়ব।

মামুন: আপনি পড়বেন না, আমি চুম্বক অংশগুলো পাঠ করে শোনাচ্ছি (বইয়ের প্রায় অর্ধেক অংশ বাছাই করে পাঠ করা হলো)।

মাহমুদ: সে রকম কিছু তো নেই। আমি পড়তে পারি না বলে আমাকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। আমাদের মিলন ঘটিয়ে তুমি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছ। তোমার প্রশ্নের ধরন এবং আমি যা বলেছি তা তো ঠিকই আছে।

মামুন: আপনার আপত্তিটি কোথায় ছিল?

মাহমুদ: না, ওটা…আপত্তি না। এখন বুঝলাম, তুমি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছ। আমার আর ওর (শামসুর রাহমান) কথায় ভিন্ন মত ছিল। তা ছাড়া তুমি একই প্রশ্ন দুজনকে করেছ, দুজনের জবাব দুই রকম হয়েছে। আমি প্রকাশককে বলব বইটি কলকাতায় পাঠাতে।

মামুন: কলকাতার ভাষা ও লেখকদের সম্পর্কে আপনার মন্তব্য ওখানে গ্রহণ করবে না।

মাহমুদ: আমি ঠিকই বলেছি। কলকাতায় বাংলা ভাষা নেই। সেখানকার লেখকেরা ঢাকার আজিজ মার্কেটে বিক্রি হতে আসে। বাংলাদেশে তাদের বই বিক্রি না হলে এবং এখানকার পাঠকদের প্রশংসা না পেলে কলকাতার লোকেদের ঘুম হয় না। ওখানকার গল্প-উপন্যাসে প্রেম-ভালোবাসাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সমাজজীবনের বহু বিচিত্র বাস্তবতা ও ভাবনার মিশেল সেখানে অনুপস্থিত। এক রবীন্দ্রনাথ নিয়েই এখনো তারা সাহিত্য-ব্যবসা করছে। মনে রাখতে হবে রবীন্দ্রনাথ উভয় বাংলার কবি। আমরা শুধু রবীন্দ্রনাথে তৃপ্ত থাকিনি। বিপুল আয়োজনে পূর্ব বাংলার সাহিত্য বিকশিত হয়েছে। ওরা আমাদের বই বাধা দিয়ে ঠেকাতে পারছে না। ওখানে আমাদের বইয়ের চাহিদা আছে। ওরা এসে ব্যক্তিগতভাবে আমাদের বই নিয়ে যায়। ওরাই আমার কাছে এসে বলে ওদের কী করুণ অবস্থা! আমি তো কলকাতায় যাই না। যখন গিয়েছি কবির মতো সম্মান করেছে। আনন্দবাজার-এ গিয়েছি, আড্ডা দিয়েছি। একবার শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে প্রভুর মতো ডাক দিল, এই ভি…চা নিয়ে আয়। বাংলাদেশের একজন কবি দৌড়ে চা নিয়ে এল। আমাকে পেয়ে সারা দিন শক্তি কোনো কাজ করেনি।

মামুন: আপনাকে এখন কলকাতায় ডাকে না কেন?

মাহমুদ: মনে হয় উত্তরটা তোমার জানা আছে! তুমিই বলো।

মামুন: জানি না, আমি জানি না।

মাহমুদ: আমি ওদের তোয়াজ করি না। আমার লেখা ওরাই যোগাযোগ করে নিয়ে যায়। শামসুর রাহমান প্রেমের কবিতা লিখেছেন। কলকাতায় তাঁকে পছন্দ করে। তিনি ওদের ভাষায় লিখেছেন, আমার ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা। পূর্ব বাংলার ভাষা আসল বাংলা ভাষা। আমরা কোনো মৃত ভাষায় সাহিত্য করি না। যাঁরা করেন, কলকাতা তাঁদের লালন করে। আমাকে তারা প্রভাবিত করতে পারেনি, জসীমউদ্‌দীনকেও পারেনি। জীবনানন্দ দাশ বরিশাল থেকে কলকাতায় গেলেন কিন্তু কবি হতে পারলেন না। মৃত্যুর পরে আমরা গবেষণা করে দেখিয়েছি তিনি কত বড় কবি ছিলেন। কিন্তু কলকাতা তাঁকে কবি বলে গ্রহণ করতে পারেনি। আমার তো ধারণা, তাঁর মারা যাওয়ার ওটাও একটা কারণ। আমার সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের কন্যার দেখা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে কথা বলে অনেক অজানা ঘটনা জেনেছি।

মামুন: শামসুর রাহমানের ওপর এখনো আপনার অভিমান আছে মনে হচ্ছে?

মাহমুদ: তিনি আমার অগ্রজ। তিনি কবিতা লিখলে আমি পড়ি না এমন হয় না। সেখানে আমার জন্য শিক্ষণীয় কিছু থাকে। তিনি কবিতায় অনেক কাজ করেছেন।

মামুন: তাঁর সঙ্গে আপনার যোগাযোগ ছিল না কেন?

মাহমুদ: তিনি ‘পদাবলী’ করলেন (১৯৮১) আমাকে আর আহসান হাবীবকে বাদ দিয়ে। রফিক আজাদ, বেলাল চৌধুরীরা এসবে ইন্ধন জুগিয়েছে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এত ক্ষুদ্র ছিলেন না। শামসুর রাহমান কোনো দিন আমাকে ফোন করেননি। আমি তাঁকে নিয়ে এমন গদ্য লিখেছি, যা জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, রশীদ করিম বা আবুল হোসেন পারেনি। তারা তাঁর কবিতার ভেতরে ঢুকতে পারত না। শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে কোনো লেখার যোগ্যতা তাঁর বন্ধুদের ছিল না। তিনি কোনো দিন আমাকে নিয়ে এক লাইনও লেখেননি। ২০০৪ সালে তোমার সঙ্গে যখন তাঁর বাসায় গেলাম, জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি কোনো জবাব দিতে পারেননি। ওঁর সঙ্গে দূরত্ব তোমরাই তৈরি করেছ।

মামুন: কীভাবে?

মাহমুদ: সেটা তোমরাই জানো।একটা সময় শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব না থাকলেও সুসম্পর্ক ছিল। তাঁর অন্তত ৩০ জনের পরে আমি ছিলাম। এখন পাশাপাশি দুজনের নাম উচ্চারিত হয়। এটা তো আমি করিনি। এখানে আমার কোনো ভূমিকা নেই। তোমরাই এখনো তাঁর সঙ্গে আমার নাম উচ্চারণ করো। তরুণ কবিরা এসে আমার কাছে শামসুর রাহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে আমি শুনতে চাই না

আমার দুঃখ হয় যে তিনি কখনো আমাকে বন্ধু বলে মেনে নিতে পারেননি। এখানে শহীদ কাদরীর ভূমিকা ছিল। এখন সে কোথায়? কবিতা শহীদকে ছেড়ে চলে গেছে বহু আগে। শহীদ বলত, টিনের স্যুটকেস, তার ওপরে ছিল গোলাপ ফুল আঁকা—এটা নিয়ে আল মাহমুদ ঢাকায় এসেছিল। স্যুটকেসের ভেতরে যে কী ছিল, সেটা শহীদ জানত না। ওদের জন্য আমার আফসোস হয়, এখন সে অন্যের ঘাড়ে বসে জীবন কাটাচ্ছে, লিখতে পারে না! কবিতা এত সোজা! বারবার হত্যা করতে আসে, রক্তাক্ত করে দিয়ে যায়। দারিদ্র্য ও বৈরী পরিবেশের ভেতর দিয়ে আমাকে এগোতে হয়েছে, কেউ আমার বন্ধু হয়নি। ছোবল মেরে নিজেই উধাও হয়ে গেছে। আল্লাহ পাক আমাকে এখনো কবিতা লেখার সুযোগ দিচ্ছেন। কয়েক বছর আগে দিল্লি গিয়েছিলাম সার্কের অনুষ্ঠানে। হলভর্তি দর্শক দাঁড়িয়ে আমাকে সম্মান জানাল যখন আমি মঞ্চে উঠলাম। অত্যন্ত নিষ্ঠা আর দরদ দিয়ে আমি কলম ধরেছি। আমি একজন দুঃখী মানুষ, কেউ আমাকে দাঁড়াতে সাহায্য করেনি। বাংলাদেশে আমি একমাত্র কবি জেল খেটেছি, এক বছর এক মাস! বঙ্গবন্ধু আমাকে সাধারণ ক্ষমায় জেল থেকে মুক্তি দিলেন। বের হয়ে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। কেউ আমাকে চাকরি দিতে চায় না। তিনি শিল্পকলা একাডেমিতে আমাকে চাকরি দিলেন। নইলে এতগুলো সন্তান নিয়ে কোথায় যেতাম আমি? আমার সন্তানদের আমি ভালো খাবার, ভালো কাপড়ের ব্যবস্থা করতে পারিনি। আমার স্ত্রী নাদিরা মাঝেমধ্যে বলে, সন্তানদের দিকে আমি ভালোমতো নজর দিইনি।

মামুন: তারা কি কখনো অভিযোগ করে?

মাহমুদ: তারা মনে মনে করতে পারে, আমি বুঝি না। তাদের কোনো দাবি হয়তো নেই।

মামুন: আপনি তাহলে ভাগ্যবান।

মাহমুদ: এরশাদ সাহেব এই জায়গাটা না দিলে আমি কোথায় থাকতাম। ঢাকায় থাকতে পারতাম না। আমার পাশে যাদের দিয়েছে—ফজল (ফজল শাহাবুদ্দিন), মুজাহিদি (আল মুজাহিদি)—ওরা তাদের জায়গা বিক্রি করে দিয়েছে। অনেক কষ্ট করে বিল্ডার্সকে দিয়ে এই ফ্ল্যাটটা পেয়েছি। কবিতার জন্যই তো এত সব,কবি না হলে অনেক আগেই আমি মারা যেতাম, কেউ আমাকে চিনত না। আল্লাহর কাছে আমি গভীর শুকরিয়া আদায় করি, তিনি আমাকে কবি হতে দিয়েছেন। অনেক জাতির মধ্যে সত্যিকারের কোনো কবি নেই। আমি আমার জাতির কবি, এটি আনন্দের এবং একই সঙ্গে গৌরবের।

মামুন: আপনি বলেছেন সন্তানদের ভালো কিছু না দিতে পারার সীমাবদ্ধতা। এখন আপনার নাতি-নাতনিরাও বেড়ে উঠছে, তাদের জন্য কিছু করে যেতে চাইছেন?

মাহমুদ: আমি আর কী করব, ওদের মা-বাবা আছে। তবে আমি ওদের জন্য যে সম্পদ রেখে যাচ্ছি, সেটা এখন না বুঝলেও নিকট ভবিষ্যতে ওরা বুঝবে কী গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ আমি ওদের জন্য রেখে যাচ্ছি। সেটা আমার সাহিত্যকর্ম, আমার কবিতা।

মামুন: আপনার বিশ্বাস, ওরা পাঠ করবে আপনার কবিতা, যখন বই থেকে নতুন প্রজন্ম মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে?

মাহমুদ: দৃঢ় বিশ্বাস থেকেই বলছি, আল মাহমুদের কবিতার মৃত্যু নেই। আমার হৃদয়ের কলম অত্যন্ত অব্যর্থ, শক্তিশালী। আমি জানি কবিতার জন্য আমাকে সবাই মনে রাখবে। এখানে আমি কিছু কাজ করার চেষ্টা করেছি। যদি আমার সময়ের অন্যদের কবিতার স্থায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাও, সেটা বলতে পারব না আমি। আমি দেখেছি জীবিত থাকতে অনেক কবি কীভাবে মৃত হয়ে যায়।

মামুন: আত্মজীবনীর আরেকটা খণ্ড করতে আগ্রহী হলেন কেন?

মাহমুদ: সব কথা বলা হয়নি। এখন মনে হয়েছে আমার জীবনের আরও অনেক কাহিনি অজানা, আমি ভুলে যাচ্ছি। এগুলো লিখতে হবে। অসুখ-বিসুখ লেগে আছে। লিখতে গেলে চোখে দেখি না। ডিকটেশন দিয়ে লেখাই। আজ বিকেলে আসবে। পত্রিকার জন্য কবিতা। গদ্য বা পদ্য। আমি দাঁড়ি, কমা পর্যন্ত বলি, তারপর লেখা হয়। এভাবে চলছে আমার সময়। নিজে না লিখতে পারলেও লেখা নিয়েই আছি। আমাকে তো চলতে হয়, নইলে খাব কী। দীর্ঘ উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম, শরীর অসুস্থ থাকে.।

Comments

comments