নামে রেড জোন, কামে লোকজন

গত মাস থেকে করোনার পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকাকে কয়েকটি জোনে কিভক্ত করেছে সরকার। সে তালিকা অনুযায়ী রেড জোন গুলোতে লকডাউন ঘোষনা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে লকডাউনের ছিটেফোটা দেখা মিলছে না।

এরপর ঘোষনা করা হয় এলাকাও সম্ভব না হলে রোগী থাকা বাড়ি লকডাউন করা হবে। করোনার এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কৌশলপত্রে এ কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে কাজটি কবে শুরু হবে, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। মূল কাজ আটকে আছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে।

লাল, হলুদ ও সবুজ এলাকা চিহ্নিত করে করোনা নিয়ন্ত্রণের কথা শোনা যাচ্ছে গত মাসের শুরু থেকে। সারা দেশে মাঠ পর্যায়ে করোনা নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান বড় কোনো সরকারি বা বেসরকারি কর্মকাণ্ড চলমান নেই। অনেকে মনে করছেন, লকডাউন শুরু করলে হয়তো করোনা সংক্রমণ আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। দেশে করোনা সংক্রমণ এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

১২ জুলাই কৌশলপত্র ও আনুষঙ্গিক নির্দেশনা চূড়ান্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে দেশের কোন কোন এলাকায় লকডাউন হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জহিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘১২টি সিটি করপোরেশন এলাকায় আমরা লকডাউনে সহায়তা করব। কোথায় লকডাউন হবে, এটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বলে দিতে হবে। ওয়ারীতে করতে বলেছে, আমরা সেখানে সহায়তা করছি।’

প্রায় একই কথা বলেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এলাকার বা বাসার তালিকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আসতে হবে। চিহ্নিত করার দায়িত্ব তাদের। তাদের সহায়তায় সিটি করপোরেশন লকডাউন বাস্তবায়ন করবে।

১২ জুলাই কৌশলপত্র চূড়ান্ত করেছে ১৩ সদস্যের কেন্দ্রীয় কারিগরি গ্রুপ। সেদিন থেকে এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তরে আছে বলে কমিটির একাধিক সদস্য জানিয়েছেন। মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘খুব শিগগির কাজটি শুরু হবে বলে আশা করি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেছেন, অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ করোনা মোকাবিলার কাজে মনোযোগ ও সময় দিতে পারছেন না। জেকেজি ও রিজেন্টকে নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ এবং মন্ত্রণালয়-অধিদপ্তরের দ্বন্দ্ব সামাল দিতে তাঁদের সময় যাচ্ছে।

লকডাউনের পূর্বাপর

লকডাউন নিয়ে আলোচনা যত হয়েছে, কাজ তত হয়নি। ১০ জুন পরীক্ষামূলক লকডাউন শুরু হয় রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার এলাকায়। শেষ দিন ৩০ জুন ১৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১১ জন করোনায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়। শনাক্তের হার ছিল ৬১ শতাংশ। সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ফলে লকডাউনের শেষ দিকে সংক্রমণের হার কম হওয়ার কথা। পূর্ব রাজাবাজারে তা হয়নি। পরীক্ষামূলক এই লকডাউনের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য এর কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।

এরপর ৪ জুলাই থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়ারীতে লকডাউন শুরু হয়েছে। ওয়ারীর আট ভাগের এক ভাগ এলাকার ৩টি সড়ক ও ৫টি গলি লকডাউনের আওতায় নেওয়া হয়েছে। বসতি প্রায় এক লাখ লোকের। লকডাউন শুরুর আগে এই এলাকায় ৪৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। এরপর ১৭০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৭০ জন শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ৪১ শতাংশ। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জনস্বাস্থ্যবিদ বলেছেন, এলাকায় তিনটি বিপণিবিতান খোলা। মানুষের চলাফেরার ক্ষেত্রেওকড়াকড়ি কম। এখানেও পূর্ব রাজাবাজারের মতো অভিজ্ঞতা হওয়ার আশঙ্কা আছে।

করোনা সংক্রমণকে কেন্দ্র করে লকডাউন শুরু হয়েছিল রাজধানীর টোলারবাগ এলাকায়। আইইডিসিআরকে এই কাজে সহায়তা করেছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সাংসদ, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর, মসজিদের ইমামসহ গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং স্থানীয় বাড়ি ও ফ্ল্যাট মালিক সমিতি। এরপর রাজধানীর বুয়েট-ঢাকেশ্বরী এলাকা, মাদারীপুর জেলার শিবচর ও গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে লকডাউন সফল হয়েছিল। অর্থাৎ এসব এলাকায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল।

ওয়ারীতে সংক্রমণ বেশি, লকডাউন ঢিলেঢালা
কৌশলপত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, লকডাউন শুধু হবে লাল এলাকায়। ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে ১ লাখ লোকের মধ্যে ৬০ জন রোগী থাকলে সেটি লাল এলাকা বলে চিহ্নিত হবে। এলাকা লাল বা হলুদ ঘোষণার আগে এলাকার শেষ ১৪ দিনের সংক্রমণ হার, দারিদ্র্য—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। দেশের অন্য শহরে সর্বশেষ ১৪ দিনে ১ লাখ মানুষের মধ্যে ৩০ রোগী শনাক্ত হলে ওই এলাকা লাল বলে চিহ্নিত হবে। গ্রাম বা ইউনিয়ন পর্যায়ে ১ লাখের মধ্যে ১০ জন রোগী থাকলে লাল এলাকা বলে বিবেচনা করা হবে। এ নিয়ে পৃথক একটি কারিগরি নির্দেশিকাও তৈরি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সিটি করপোরেশনের বাইরে অন্য সব এলাকায় লকডাউন বাস্তবায়ন করবে করোনা মোকাবিলায় গঠিত জেলা কমিটি।

কারিগরি কমিটির একাধিক সদস্য বলেছেন, কারিগরি নির্দেশিকা ব্যবহার করে লাল, হলুদ ও সবুজ এলাকা চিহ্নিত করবে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা জেলা কমিটি। জটিল এই নির্দেশিকা ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ দরকার হবে। কাজ শুরু হওয়া তো দূরের কথা, কৌশলপত্র ও কারিগরি নির্দেশিকা কোথাও পাঠায়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন ও জেলা কমিটিগুলো এ ব্যাপারে অন্ধকারে আছে।

কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, সব এলাকা বা জোনে সাধারণ ১৬টি বিধি মেনে চলতে হবে। যেমন: লাল, হলুদ বা সবুজ যে এলাকাই হোক না কেন, সেখানে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হবে। সভা-সমাবেশ সব এলাকার জন্য নিষেধ।

কৌশলপত্রে বাড়ি, অফিস, কাঁচাবাজার, মুদিদোকান, ব্যক্তিগত গাড়ি, শিল্পকারখানা ব্যবস্থাপনা কী হবে, সেই নির্দেশনা দেওয়া আছে। এরপর লাল, হলুদ ও সবুজ এলাকার জন্য পৃথক পৃথক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। লাল এলাকার জন্য পৃথক ২১টি নির্দেশনা আছে। হলুদ এলাকার জন্য পৃথক ৮টি নির্দেশনার কথা বলা আছে। পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, সেলুন-পারলার, শপিং মল কীভাবে চলবে, তা বলা আছে। ট্যাক্সি, রাইড শেয়ারিং, মোটরবাইক, রিকশার জন্য বিধিবিধান বলা আছে। আর সবুজ এলাকার জন্য আছে ১০টি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লকডাউন কার্যকর হচ্ছে কি না, তা প্রতি সপ্তাহে পর্যালোচনা করতে হবে। তাঁরা বলছেন, লোক চলাচল, যানবাহন চলাচল, স্বাস্থ্যবিধি, জনপরিসর ব্যবস্থাপনা, শনাক্ত রোগী ব্যবস্থাপনা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং (রোগীদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খোঁজা) এবং লাল এলাকা ব্যবস্থাপনা—এই বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করতে হবে।

সতর্কতা দরকার

তবে কিছু বিষয়ে সতর্কতার দরকার আছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। যেমন কৌশলপত্রে রোগী আছে এমন বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট লকডাউন করার কথা বলা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে দুটি সমস্যা হতে পারে। প্রথমত একটি বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট লকডাউন করলে তার বাসিন্দাদের মানসিক চাপে পড়ার ঝুঁকি আছে। এ ক্ষেত্রে ভাড়াটেদের ওপর চাপ আসতে পারে বাড়িওয়ালার পক্ষ থেকে। দ্বিতীয়ত পৃথক পৃথক বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করার মতো জনবল সিটি করপোরেশনগুলোর নেই।

বিরাট এলাকা একসঙ্গে লকডাউন করলে ব্যবস্থাপনায় সুবিধা হয় এবং রোগনিয়ন্ত্রণও সহজ হয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কিন্তু এর আর্থিক প্রভাব অনেক গভীর পর্যন্ত গড়ায়। যারা দিন আনে দিন খায়, দিনমজুর, ছোট ব্যবসায়ী বা যাদের সঞ্চয় নেই, তাদের পক্ষে ১৪ দিন বা ২১ দিন ঘরে বন্দী অবস্থায় থাকা সম্ভব নয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, জীবিকার প্রশ্নটি অনেক বড়। বিরাট এলাকা লকডাউন করার অর্থ বহু মানুষকে জীবিকা থেকে দূরে রাখা। সেই বিবেচনা থেকে বাড়ি বা অতি ছোট এলাকাকে লকডাউন করার কথা ভাবা হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বাসিন্দাদের সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ঝুঁকি থাকলে সেই বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট লকডাউন করা ঠিক হবে না। এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কাজে যুক্ত হলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’

অন্যদিকে বলা হচ্ছে, লাল এলাকায় ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা ‘করোনা ট্রেসার বিডি’ অ্যাপ ব্যবহার করবেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সবাইকে মোবাইল ব্লুটুথ খোলা রাখতে হবে।

এ ক্ষেত্রেও একাধিক সমস্যা হতে পারে। প্রথমত কাজটি কেন মানুষ করবে, তা তারা জানে না। এই কাজ করলে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ঝুঁকির মুখে পড়লে মানুষ লকডাউন ব্যবস্থা থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেবে। অন্যদিকে যার স্মার্টফোন নেই, সে কী করবে, তা কৌশলপত্রে বলা নেই।

জনস্বাস্থ্যবিদ বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘স্মার্টফোন যাদের নেই, তারা এই সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। এটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।’

সূত্র: প্রথম আলো

Comments

comments