অভিনব পদ্ধতিতে চাঁদা আদায় করছে নিকেতন সোসাইটি

নিকেতন সোসাইটির এক বাসিন্দার অনলাইন শপে অর্ডার করা আম এসেছে, আরেকজন অর্ডার করেছিলেন নিত্যপণ্য। নিকেতনের এই দুই বাসিন্দাকে পণ্য ডেলিভারি পাওয়ার ক্ষেত্রে সোসাইটির গেটে মানি রিসিট নিয়ে টাকা দিতে বলা হয়। তবে নিকেতন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি বলছে, ছোট ডেলিভারির ক্ষেত্রে নয়, বড় ডেলিভারি নিয়ে পিকআপ বা ট্রাক এলে টাকা রাখা হয়। স্থানীয় কাউন্সিলর বলছেন, সিটি করপোরেশনের ভেতরে পরিবহন চলাচলের ক্ষেত্রে টাকা দেওয়ার এমন কোনো নিয়ম নেই।

৭ জুলাই নিকেতনের বাসিন্দা রানা রফিকুল একটি অনলাইন শপ থেকে আম অর্ডার করেন। রাত ৯টার দিকে তা ডেলিভারি দিতে এলে সোসাইটির পক্ষ থেকে নিরাপত্তাকর্মীরা টাকা চান। রানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগেও অর্ডার করেছি, এমন হয়নি কখনো। আমার পাঁচ কেজি আম আসার কথা একটি অনলাইন শপ থেকে। তাঁরা একটি ছোট পিকআপ ভ্যানে করে নিয়ে এসেছিল। তখন গেটের কাছে এসে বলল, দারোয়ান ঢুকতে দিচ্ছে না। একটা মানি রিসিট নিতে হবে। তখন বলল যে এক হাজার টাকার বাজার হলে ১০০ টাকা এবং ২ হাজার টাকার বাজার হলে ২০০ টাকার মানি রিসিট। অর্থাৎ এভাবে হাজারপ্রতি ১০০ করে দিতে হবে। আমার ওই আমের সঙ্গে আগের আরও কিছু টাকা মিলিয়ে একসঙ্গে ৬ হাজার টাকা মূল্যের পণ্য ছিল। তাই গেটে বলা হয়, আমি ৬০০ টাকা দিলে ওরা ওই পিকআপ সোসাইটিতে ঢুকতে দেবে।’

হোম ডেলিভারির ক্ষেত্রে চার্জ দিয়েই পণ্য বুঝে পান গ্রাহক। সে প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রানা রফিকুল বলেন, ‘আমি এই টাকা কেন দেব? আমি তো ডেলিভারি চার্জ দিয়েই এনেছি। আগেও তো এনেছি, তখন তো দিতে হয়নি। তখন দারোয়ান বললেন, সোসাইটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার জন্য। এটা নাকি নতুন হয়েছে। তখন আমি হেঁটে গিয়ে আম নিয়ে আসি। আমি নিজে নিয়ে এলে তখন আর টাকা চায়নি।’ তিনি জানালেন, সোসাইটির আরও অনেকেই এই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন।

নিকেতনের আরেক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করে বলেন, তিনি সম্প্রতি নিত্যপণ্য অর্ডার করেছিলেন। তা বুঝে পেতে নিকেতন সোসাইটির গেটে তাঁর কাছ থেকে টাকা চাওয়া হয়।

নিকেতন সোসাইটির বাসিন্দা শিক্ষক ও গবেষক আফসান চৌধুরী ১১ জুলাই ফেসবুকে সোসাইটি থেকে বাড়তি টাকা নেওয়ার বিষয়ে পোস্ট দেন। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে আফসান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, নিকেতন বাসিন্দাদের একটি ফেসবুক গ্রুপ রয়েছে। সেখানে তিনি হোম ডেলিভারি পাওয়ার ক্ষেত্রে নিকেতন সোসাইটির পক্ষ থেকে টাকা রাখার কিছু অভিযোগ দেখতে পেয়েছেন। তাই তিনি পোস্টটি করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এভাবে টাকা নেওয়ার কোনো আইনি অধিকার ওদের নেই। এই চাঁদা নেওয়াটা অবৈধ। সরকার ছাড়া কেউ এভাবে ট্যাক্স বসাতে পারে না।’

নিকেতন হাউজিং সোসাইটির দেখভালের জন্য ফ্ল্যাটমালিকদের নির্বাচিত একটি কমিটি রয়েছে নিকেতন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নামে। কমিটির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম সহিউজ্জামান হারিছ এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোটরসাইকেল বা সাইকেলে আসা ডেলিভারির ক্ষেত্রে কোনো টাকা রাখা হয় না। একটা অভিযোগ পেয়েছি, সেটা খোঁজ নিচ্ছি।’ তবে তিনি বলেন, ‘পিকআপ নিয়ে এলে টাকা রাখবে। এটা আমাদের আগেরই নিয়ম। বড় কোনো গাড়ি, পিকআপ বা ছোট ট্রাক দিয়ে ডেলিভারি দিতে এলে টাকা নেওয়া হয়। ধরেন একটা ব্রিজ পার হইতে গেলেও টোল দেওয়া লাগে। তবে টাকা কে দেবে সেটা ব্যাপার না। পিকআপ, ট্রাক ঢুকতে হলে টাকা দিতে হবে।’

টাকা নেওয়ার কারণ হিসেবে এ কে এম সহিউজ্জামান হারিছ বলেন, ‘সোসাইটি নিজস্ব অর্থায়নে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে। ওষুধ দেয়, সিকিউরিটির ব্যাপার আছে। মাসে ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকা যায় এসব দেখভাল করতে। সোসাইটির তো নিজস্ব কোনো আয় নেই। এ ছাড়া কেউ এখানে বাড়ি করলে যে ট্রাক ঢুকবে সেসবের ক্ষেত্রেও টাকা রাখা হয়।’

তবে তিনি জানান, মানি রিসিট দিয়ে টাকা নিলে সেটা সোসাইটির কাছে যাবে। এর বাইরে কেউ টাকা নিলে তার অভিযোগ পেলে তাঁরা ব্যবস্থা নেবেন।

নিকেতনের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, প্রতি মাসের ভাড়ার সঙ্গে আলাদা সার্ভিস চার্জ দিয়ে থাকেন। নিকেতন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নামে একটি রিসিটে প্রতি মাসে নিরাপত্তা, মশা, কীটনাশক, আবর্জনার জন্য ৪৫০ টাকা করে রাখা হয়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে নিকেতন আবাসিক এলাকা। এ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. নাছির প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা তো করা উচিত না। এই রকম তো নিয়ম নাই। এটা তাঁরা করতে পারে না। এখানকার সব বাসিন্দাই আলাদা সার্ভিস চার্জ দিয়েই থাকে। তাহলে এসবের জন্য তো আলাদা করে টাকা নিতে পারে না।’ তিনি জানান, কেউ তাঁর কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে তিনি বিষয়টি দেখবেন।

Comments

comments